বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। জিনগতভাবে পরিবর্তিত বা জেনিটিক্যালি মডিফাইড একটি শূকরের কিডনি মানবদেহে প্রতিস্থাপনের পর রেকর্ড ৯ মাস বা ২৭১ দিন বেঁচে থেকে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৬৬ বছর বয়সী নাগরিক টিম অ্যান্ড্রুস। ‘উইলমা’ নামের একটি বিশেষ জাতের শূকরের কিডনি তাঁর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই কিডনিটি অকার্যকর হতে শুরু করলে মৃত মানুষের দান করা একটি কিডনি তাঁর শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কারণে টিম অ্যান্ড্রুসের দুটি কিডনিই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, মানব কিডনি পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষায় তাঁর বেঁচে থাকার বা প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা পাঁচ বছরের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ ছিল। উল্টো দিকে তাঁর মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল ৪০ শতাংশের বেশি। মানব অঙ্গের তীব্র সংকটের কারণে চিকিৎসকেরা শেষ পর্যন্ত তাঁর শরীরে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের এই ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু জীবনরক্ষাকারী সিদ্ধান্ত নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা ‘ইয়ুকাটান মিনিয়েচার’ জাতের শূকর ‘উইলমা’র কিডনি অ্যান্ড্রুসের শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেন। মানুষের শরীরের সঙ্গে অঙ্গটি খাপ খাইয়ে নিতে শূকরটির জিনে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার আক্রমণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা এবং শূকরের দেহে থাকা কোনো ভাইরাস বা ক্ষতিকর জীবাণু মানুষের শরীরে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি দূর করা।
প্রতিস্থাপনের পর টিম অ্যান্ড্রুস একটানা ২৭১ দিন কোনো ধরনের ডায়ালাইসিস ছাড়াই বেঁচে ছিলেন। জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি নিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার ইতিহাসে এটিই এখন পর্যন্ত দীর্ঘতম সময়। একই সঙ্গে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে শূকরের কিডনি কোনো রোগীর শরীরে মানব কিডনি পাওয়ার আগপর্যন্ত একটি কার্যকর ‘সেতু’ (Bridge) হিসেবে কাজ করেছে।
প্রায় ছয় মাস পর শূকরের কিডনিটির রক্তনালিতে ক্ষতির কিছু লক্ষণ দেখা দেয় এবং ক্রমান্বয়ে সেটি বিকল হতে শুরু করে। এর প্রায় ৯ মাস পর কিডনিটি শরীর থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর কিছুদিন ডায়ালাইসিস নেওয়ার পর অ্যান্ড্রুস এক মৃত দাতার কাছ থেকে মানুষের সুস্থ কিডনি লাভ করেন। পরবর্তী ছয় মাসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তাঁর নতুন মানব কিডনিটি অত্যন্ত ভালোভাবে কাজ করছে এবং বড় ধরনের কোনো রোগপ্রতিরোধজনিত জটিলতা দেখা দেয়নি।
এর আগে ২০২৪ সালে জীবিত মানুষের শরীরে প্রথমবার শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের ঘটনা ঘটলেও ওই রোগী মাত্র ৫২ দিন পর হৃদ্যন্ত্রের জটিলতায় মারা যান। এর আগে প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দুই মাসের বেশি সময় বেঁচে থাকার কোনো রেকর্ড ছিল না। সেই তুলনায় টিম অ্যান্ড্রুসের ৯ মাস বেঁচে থাকার এই ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিশাল সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখনো একজন মাত্র রোগীর ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। শূকরের কিডনি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শরীরে কতটা নিরাপদ, স্থায়ী ও কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও বড় পরিসরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।