নওগাঁয় সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বাড়তি দাম আদায়ের অভিযোগ
নওগাঁয় আমন মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে প্রতি বস্তায় ৪০০-৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ক্ষুব্ধ কৃষকদের পাশে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের।
বিশেষ প্রতিবেদক: বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এককালের কেবল বাণিজ্য ও যোগাযোগের সমুদ্রপথ আজ অর্থনৈতিক শক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ চীন সাগর ও বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা এবং এর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এখন নতুন এক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
পূর্ব এশিয়ার শিল্পোন্নত অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান জলপথ ‘মালাক্কা প্রণালি’। চীনের বিপুল বাণিজ্য ও জ্বালানি আমদানির বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কোনো সংঘাতে এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে দেশটির অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘মালাক্কা দ্বিধা’ নামে পরিচিত। এই ঝুঁকি কমাতে মিয়ানমারের কিয়াকফিউ বন্দর থেকে চীনের ইউনান পর্যন্ত তেল ও গ্যাস পাইপলাইনসহ বিভিন্ন বিকল্প জ্বালানি পথ তৈরি করেছে চীন। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগর চীনের জন্য একটি বিকল্প জ্বালানি প্রবেশপথে পরিণত হয়েছে।
কിയাকফিউ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী ও মোংলা—পুরো অঞ্চলটি এখন বৃহত্তর ভূ-অর্থনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রসীমা অর্জিত হলেও সেই সমুদ্রসম্পদের যথাযথ অর্থনৈতিক ব্যবহার ও নীল অর্থনীতি (Blue Economy) এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। চট্টগ্রাম ও মোংলার পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে আধুনিক আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করা গেলে বাংলাদেশ নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য একটি প্রধান ট্রানজিট ও পণ্য সরবরাহকেন্দ্রে রূপ নিতে পারে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি বাড়ছে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও। চীন বঙ্গোপসাগরে উপস্থিতি বাড়ালেও ভারতের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে ভারতও আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নজরদারি বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোনো পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ‘সম্মুখসারির রাষ্ট্র’ না হয়ে নিজের কৌশলগত গুরুত্বকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।
নীতিগতভাবে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট হওয়া উচিত—দেশের কোনো বন্দর, দ্বীপ বা সামরিক স্থাপনা যেন কোনো বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে তৃতীয় পক্ষের সামরিক কর্মকাণ্ডের প্ল্যাটফর্মে পরিণত না হয়। পেকুয়া ঘাঁটি বা সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মতো কৌশলগত স্থানগুলোকে বিদেশি সামরিক প্রতিযোগিতার বাইরে রেখে পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটন ও জাতীয় নিরাপত্তার সমন্বিত দৃষ্টিতে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে বহুমুখীকরণ। চীন থেকে অবকাঠামো ও প্রযুক্তি গ্রহণ করা হলেও ঋণের শর্ত যাচাই করতে হবে; যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও প্রযুক্তি নেওয়ার পাশাপাশি নীতি-স্বাধীনতার বিষয়টি বজায় রাখতে হবে; এবং ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি নিজস্ব স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। একই সঙ্গে জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে হবে।
সবশেষে, বঙ্গোপসাগরকে কোনো পরাশক্তির সামরিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে এটিকে বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও সমৃদ্ধির সেতুতে পরিণত করতে হবে। দক্ষ কূটনীতি, আধুনিক অবকাঠামো এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশের এই ভূগোলকে প্রকৃত শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।