ধর্ম

ইসলামে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের মর্যাদা ও ইতিহাস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো শারীরিক, ইন্দ্রিয়গত বা মানসিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে বসবাস করছেন। বর্তমান বিশ্বে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের আলোচনা চললেও, ইসলাম সূচনালগ্ন থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে অক্ষমতা নয়, বরং স্বাভাবিক মানবিক বৈচিত্র্য এবং সমাজের অংশীদারত্বের জায়গা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
মানুষের শারীরিক গঠন, মেধা কিংবা সক্ষমতার পার্থক্যকে কোরআন কোনো অপূর্ণতা হিসেবে দেখে না; বরং একে আল্লাহর গভীর প্রজ্ঞাময় সৃষ্টির বৈচিত্র্য হিসেবে বর্ণনা করে। সৃষ্টিজগতের এই বৈচিত্র্য সমাজে পারস্পরিক নির্ভরতা ও শ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরি করে।
ইসলামি আইনের প্রধান একটি দর্শন হলো—‘সাধ্যের বাইরে কারও ওপর বোঝা না চাপানো’। কোরআনে বলা হয়েছে:
“অন্ধের কোনো অপরাধ নেই, খোঁড়ার কোনো অপরাধ নেই এবং পীড়িতেরও কোনো অপরাধ নেই।” (সুরা ফাতহ, আয়াত: ১৭)
যুদ্ধ কিংবা জটিল দায়িত্ব পালনে অক্ষম ব্যক্তিদের ওপর অহেতুক দায় না চাপিয়ে তাঁদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখাই এই আয়াতের মূল শিক্ষা। ইসলামের ইতিহাসে নবীদের জীবনের নানা শারীরিক পরীক্ষাও ছিল প্রজ্ঞাময়। যেমন—নবী ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন, নবী আইয়ুব (আ.) দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভোগেন এবং নবী মুসা (আ.)-এর বাচনিক জড়তা ছিল। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো শারীরিক প্রতিকূলতাই মানুষের আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতাকে আটকে রাখতে পারে না।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য নামাজ, রোজা কিংবা অজুর ক্ষেত্রে বহু সহজ নিয়ম রাখা হয়েছে। এমনকি উত্তরাধিকার বণ্টন, পারিবারিক অভিভাবকত্ব এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁদের অর্থনৈতিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ইসলাম।
প্রাচীন মুসলিম চিন্তাবিদ ও ইতিহাসবিদরা ভিন্ন সক্ষমতার মানুষের জীবন ও অবদান নিয়ে বিস্তৃত সংকলন তৈরি করেছেন:
আবু ওসমান আল-জাহিজ (মৃ. ২৫৬ হি.): তিনি ‘আল-বুরসান ওয়াল উরজান ওয়াল উময়ান ওয়াল হাওলান’ গ্রন্থে শারীরিক বৈকল্য থাকা সত্ত্বেও সমকালীন সমাজের শীর্ষ পদে আসীন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন তুলে ধরেন।
সালাহুদ্দিন আস-সাফাদি (মৃ. ৭৬৪ হি.): তিনি ‘নাকতুল হিময়ান ফি নুকাতিল উময়ান’ নামের একটি সুবিশাল বিশ্বকোষ সংকলন করেন, যেখানে সাড়ে পাঁচ শতাধিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কবি, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের অবদান সংরক্ষিত রয়েছে।
ইউসুফ ইবনে আবদুল হাদি: তিনি ‘আদ-দাবত ওয়াত-তাবয়িন লি-যাবিল ইলাল ওয়াল আহাত মিনাল মুহাদ্দিসিন’ গ্রন্থে শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত বহু প্রথিতযশা হাদিসবিশারদদের নির্ভরযোগ্যতা ও অনন্য মুখস্থশক্তির দলিল পেশ করেছেন।
ইসলামি ইতিহাসে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অসংখ্য ব্যক্তিত্ব জ্ঞান, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন:
ইমাম কালুন: পবিত্র কোরআনের বিশুদ্ধ তিলওয়াত পদ্ধতির এই প্রধান শিক্ষক ছিলেন সম্পূর্ণ বধির। তিনি কানে কোনো আওয়াজ শুনতেন না, অথচ ছাত্রের ঠোঁটের নড়াচড়া দেখেই সূক্ষ্ম ভুল ধরে দিতেন।
ইমাম আশ-শাতিবি: কিরাত শাস্ত্রের কালজয়ী পণ্ডিত ইমাম আশ-শাতিবি ছিলেন জন্মগত অন্ধ।
আতা ইবনে আবি রাবাহ: তাবেয়ি যুগের এই শ্রেষ্ঠ আইনজ্ঞ ও মক্কার প্রধান মুফতি ছিলেন দৃষ্টিহীন ও গুরুতরভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তবুও উমাইয়া খলিফাদের নির্দেশ ছিল—হজের মৌসুমে আতা ইবনে আবি রাবাহ ছাড়া অন্য কেউ ফতোয়া দেওয়ার কর্তৃত্ব রাখবেন না।
ইবনে হুরমুজ: ইমাম মালিকের অন্যতম শিক্ষক আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে হুরমুজ ছিলেন বধির; তবে যেকোনো সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটে মদিনার মানুষ তাঁর কাছেই পরামর্শের জন্য ছুটে যেত।
আধুনিক যুগের মনীষী: বিশ শতকের বিশ্বনন্দিত আলেম শেখ আবদুল আজিজ ইবনে বাজ, মিসরের বিশ্বখ্যাত বাগ্মী শেখ আবদুল হামিদ কিশক এবং আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের বুদ্ধিজীবী মুহাম্মদ আল-বাশির আল-ইব্রাহিমি নিজ নিজ শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয় করে যুগের অন্যতম সেরা পথপ্রদর্শক হয়েছিলেন।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষকে কেবল করুণা বা দয়ার চোখে দেখা তাঁদের আত্মসম্মানকে আহত করে। ইসলাম শেখায়, মানুষের আসল পরিচয় তার শারীরিক অবয়বে নয়, বরং তার মেধা, সদিচ্ছা ও কর্মে।
আজকের সমাজে তাঁদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হাঁটাচলার রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবাধ প্রবেশাধিকার, সম্মানজনক কর্মসংস্থান এবং স্বাভাবিক নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। উপযুক্ত পরিবেশ আর সুযোগ পেলে তাঁরাই সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের সবচেয়ে সৃজনশীল কারিগর হয়ে উঠতে পারেন।

Related News

হেদায়েত লাভ ও তা ধরে রাখার উপায়

হেদায়েত আল্লাহর এক বিশেষ দান। কোরআনের আলোকে হেদায়েত লাভ এবং তার ওপর অবিচল থাকার কার্যকরী উপায়সমূহ নিয়ে বিশেষ জীবনঘনিষ্ঠ প্রতিবেদন।

উপাসনালয়ের কর্মীদের সম্মানী ও ভাতা দিতে নতুন নীতিমালা জারি

দেশের মসজিদ, মন্দির ও গির্জার সেবকদের জন্য সম্মানী, উৎসব ভাতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রেখে ‘সম্মানী ও কল্যাণ সহায়তা প্রদান নীতিমালা ২০২৬’ জারি।

বরিশাল এবাদুল্লাহ মসজিদে তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী সিরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল শুরু

বরিশাল চকবাজার জামে এবাদুল্লাহ মসজিদে ২২ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৩ দিনব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল। বিস্তারিত পড়ুন দৈনিক শব্দমিছিলে।

জাতীয় ইমাম সমাজের আলেম সম্মেলন ও বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর ডাক

জাতীয় ইমাম সমাজ বাংলাদেশ ২০২৬, মাওলানা বেলায়েত হোসাইন আল-ফিরোজী, ওলামা মাশায়েখ সম্মেলন ৮ সেপ্টেম্বর, ঢাকার থানা কমিটি পুনর্গঠন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ বিতরণ, রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান কলাম, দৈনিক শব্দমিছিল সম্পাদকীয়

পবিত্র কাবা শরিফে নতুন কিসওয়া পরানো হয়েছে: হিজরি নববর্ষ ২০২৬

নতুন হিজরি বছর উপলক্ষে কাবা শরিফে নতুন গিলাফ বা কিসওয়া পরানো হয়েছে। ১৫০ জন কারিগরের ১১ মাসের শ্রমে তৈরি এই গিলাফে ব্যবহার করা হয়েছে সোনা ও রুপার প্রলেপ।

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহা: আত্মশুদ্ধি ও মানবতার জয়গান

কুরবানির মূল চেতনা লুকিয়ে আছে ইসলামের মহান নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর এক অবিস্মরণীয় ত্যাগ ও পরীক্ষার মধ্যে। মহান আল্লাহর নির্দেশে নিজের প্রিয়তম পুত্রকে কুরবানি করার যে চরম সিদ্ধান্ত হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিয়েছিলেন, এবং পিতার সিদ্ধান্তে পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) যেভাবে হাসিমুখে আত্মসমর্পণ করেছিলেন—তা পৃথিবীর ইতিহাসে আনুগত্য ও ত্যাগের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।

আজ পবিত্র শবে বরাত ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল সারাদেশ

৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে পবিত্র শবে বরাত। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিশেষ দোয়া ও ওয়াজ মাহফিলের সময়সূচি।

রমজানে ওমরাহ প্যাকেজের খরচ দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা

রমজানে ওমরাহ পালনের খরচ দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বাড়তে পারে। ওমরাহ ভিসার শেষ সময় ১৭ মার্চ। বিস্তারিত ওমরাহ প্যাকেজ ও হোটেল ভাড়ার তথ্য জানুন।

Search