কৃষি ও অর্থনীতি

‘ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি’ তত্ত্ব ও বাস্তবতার খতিয়ান

ঢাকা: গত ২৮ আগস্ট একাত্তর টিভির ‘বিজনেস উইকএন্ড’ অনুষ্ঠানে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টার একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। সেখানে তিনি বর্তমানের সব সংকটের জন্য পতিত সরকারের তৈরি ‘জঞ্জাল সাফ’ করার কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করেন। উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রবচন টেনে বলেন, ‘যা–কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, “কেষ্টা বেটাই চোর।”’ অর্থাৎ, তাঁর মতে কোনো সংকটই সমসাময়িক নয়, সবই পুঞ্জীভূত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের পতন এবং বর্তমান সরকারের মধ্যবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন দেড় বছরের শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা বা অর্থনীতির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে কোনো কথা না বলে সরাসরি বর্তমান সরকারের কাঁধে দায় চাপানোর এই ‘উচ্চলম্ফ’ কতটা যুক্তিযুক্ত?

অর্থমন্ত্রী নিজে যেখানে ১৮ মাসের শাসনে অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এবং তথ্যেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে, সেখানে ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি’ বা ‘ডেভাস্টেটেড ইকোনমি’ শব্দটি ক্রমাগত ব্যবহার করা একধরনের অতিকথন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে তিরিশের মহামন্দা, বিশের দশকে জার্মানির উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চীনের মহালম্ফকাল কিংবা ১৯৯৮-২০০২ এর আর্জেন্টাইন সংকটের মতো ঘটনাগুলো বিবেচনা করা হয়, যেখানে জিডিপি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হয়েছিল। বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের ইতিহাসে কেবল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের পরই কেবল অর্থনীতি প্রকৃত অর্থে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল, যার প্রবৃদ্ধি নেমেছিল ঋণাত্মক ১৪ শতাংশে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী আমলেও গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০০৬ সালের ৮০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি আওয়ামী আমলে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে এবং পরবর্তীতে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বর্তমান বিএনপি সরকার তো ২০৩৪ সালের মধ্যে এই অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন বা ১০০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। সুতরাং, ৪৫০ বিলিয়নের একটি বিকাশমান অর্থনীতিকে ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ আখ্যা দেওয়া অর্থনীতির মৌলিক সংজ্ঞার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও ইতিপূর্বে ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ শব্দটির সপক্ষে সরকারের কাছে দালিলিক দলিল দাবি করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত ছিল কোভিড-উত্তর গত পাঁচ বছরের অর্থনীতির একটি পূর্ণাঙ্গ ‘রিভিউ’ বা স্টকটেকিং রচনা করা, যেখানে আওয়ামী ও অন্তর্বর্তী—উভয় আমলের চিত্রই স্পষ্ট থাকত। কিন্তু তা না করে কেবল অতীতের ওপর দায় চাপানোর রাজনীতি শুরু হয়েছে।

একজন রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রী রাজনৈতিক বক্তব্য দিতেই পারেন, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির একজন শিক্ষকের কাছ থেকে জনগণ আবেগপ্রবণ ও তথ্যহীন বয়ান আশা করে না। গবেষকদের হতে হয় বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক। উন্নয়ন একটি ক্রমসঞ্চয়মান প্রক্রিয়া, যেখানে অতীতের ভালো ও মন্দ উভয় দিকই স্বীকার করা জ্ঞানগত সৌজন্যের পরিচায়ক। বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে তথ্য ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি পরিচালনার মাধ্যমেই সঠিক পথে এগোতে হবে।

Related News

বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে দুই দিন পর চালু হলো ৩০ ব্যাংকের কিউ-ক্যাশ ডিজিটাল লেনদেন সেবা

বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে নির্ধারিত সময়ের আগেই দুই দিন পর স্বাভাবিক হয়েছে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাধীন ৩০টি ব্যাংকের এটিএম ও ডিজিটাল লেনদেন সেবা। অর্থনীতি সংবাদ।

মাল্টার চেয়ে ১৪৬ গাড়ি আমদানিতে শুল্ক কর কম

প্রতি কেজি মাল্টার আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা হলেও শুল্ক-কর দিতে হচ্ছে প্রায় ১০৭ টাকা। মোট শুল্ক-করভার ১২১.৭৮ শতাংশ, যা ১৪৬টি গাড়ির চেয়েও বেশি।

ফ্যামিলি কার্ডে আরও ২৮.৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব: বিশ্বব্যাংক

ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে খাদ্য ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা কর্মসূচির সমন্বয় করলে বাংলাদেশে আরও ২৮.৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে, বাড়ছে দারিদ্র্য ও বৈষম্য: বিশ্বব্যাংক

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ ও রপ্তানি কমা, জ্বালানি সংকট এবং মূল্যস্ফীতির চাপে বাড়ছে দারিদ্র্য।

সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বৃদ্ধি ও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। অন্যদিকে ব্যাংকে সরকারের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতির গতিপথ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। অর্থনীতি সংবাদ।

ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ল লিটারে প্রায় ১২ টাকা

ফার্নেস অয়েলের দাম লিটারে ১১ টাকা ৯২ পয়সা বাড়িয়েছে বিইআরসি। নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে লিটারপ্রতি ১০৮ টাকা ৭৮ পয়সা, যা ৩০ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে বাংলাদেশ

গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৬-এ ২১.৫ স্কোর নিয়ে ১৩৯ দেশের মধ্যে ১০৫তম বাংলাদেশ। নেপাল ১০৪তম হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার ছয় অর্থনীতির মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমেছে দেশটি।

ডলারের দাম বেড়ে ১২৩ টাকা ৩ পয়সা

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের গড় দাম বেড়ে ১২৩ টাকা ৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। পাউন্ড, রুপি, ইউয়ান ও সিঙ্গাপুরি ডলারের দামও বেড়েছে।

Search