সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

গ্যাস-সংকট এবং বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের সার সরবরাহব্যবস্থায় এক বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি করেছে। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ক্ষুব্ধ কৃষকদের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়া কিংবা লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে চড়া দামের প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ত্রুটি নয়। এগুলো মূলতঃ আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, সার উৎপাদন ও জ্বালানিনির্ভরতার গভীর কাঠামোগত সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।

আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে যেখানে দেশে প্রায় ৬৭ লাখ ৭০ হাজার টন সারের চাহিদা রয়েছে, সেখানে দেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা গ্যাস-সংকটে বন্ধ থাকায় মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই এখন আমদানিনির্ভর। এই পরিস্থিতি আমাদের কৃষি খাতকে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

আধুনিক কৃষির প্রধান ভিত্তি সার, আর ইউরিয়া উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল ও জ্বালানি হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের পাঁচটি প্রধান ইউরিয়া কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দিনে প্রায় ১৯৭ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউএফএল) ও কাফকোর মতো বৃহৎ কারখানাগুলো নিয়মিত উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে হরমুজ প্রণালির ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সরবরাহ কড়াকড়ির কারণে ২০২৬ সালে সারের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। বৈশ্বিক এই বৈরী বাতাস যখন দেশের ডিজেলচালিত সেচ, পরিবহন ও সারের দামের ওপর চাপ তৈরি করে, তখন কেবল উচ্চমূল্যেই নয়, বরং সার অপ্রাপ্তির আশঙ্কায় উৎপাদন খরচ বেড়ে খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।

ফলে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি এখন আর কেবল কৃষির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বজনীন বা সাময়িক ভর্তুকি দিয়ে সামাল দেওয়ার যে ঐতিহ্যগত ধারা, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। খাদ্যনিরাপত্তাকে সংকট তৈরির পর সামাল দেওয়ার বিষয় হিসেবে না দেখে আগাম ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

কৌশলগত মজুত ও নিয়ন্ত্রণ: আসন্ন রবি মৌসুমের আগেই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সারের কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করতে হবে। ডিলারদের বরাদ্দ ও বিক্রয় প্রক্রিয়ায় কঠোর তদারকি চালিয়ে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কালোবাজারি রোধ করা প্রশাসনিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

উৎসের বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক আমদানিনির্ভরতা হ্রাস: একক কোনো দেশ বা অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে সারের আন্তর্জাতিক আমদানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা দরকার। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক কারখানাগুলোর দক্ষতা পুনঃমূল্যায়ন করে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানির একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল নির্ধারণ করা আবশ্যক।

সুষম সার প্রয়োগ ও পরিমিত ব্যবহার: মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্যমতে দেশের ৭৬ শতাংশ জমিতে উর্বরতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত সার প্রয়োগ। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষম সার ব্যবহারে কৃষককে সচেতন করা গেলে সারের অপচয় ও খরচ দুই-ই কমবে।

জ্বালানিনির্ভরতা হ্রাস ও সৌরবিদ্যুৎ সেচ: কৃষিতে সেচের জন্য ডিজেলের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ ও সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, যা সরাসরি উৎপাদন খরচ কমাবে।

প্রান্তিক কৃষক ও নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা: বিশ্ববাজারের অস্থিরতার পুরো বোঝা কৃষকের কাঁধে না চাপিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক (Targeted) প্রণোদনা এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বলয় জোরদার করা দরকার।

খাদ্য-জ্বালানি-সার সমন্বিত পূর্বাভাস ব্যবস্থা: কৃষি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি আগাম ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করা প্রয়োজন, যা আন্তর্জাতিক বাজারের দর, দেশের গ্যাস সরবরাহ ও সারের মজুতের তথ্য প্রকাশ করে পূর্বপ্রস্তুতির সঠিক দিকনির্দেশনা দেবে।

বৈশ্বিক জ্বালানি ও সারের বৈরী বাজার নিয়ন্ত্রণ করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে আগাম প্রস্তুতি ও সঠিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে দেশের কৃষি ও কৃষককে সেই ধাক্কা থেকে রক্ষা করা সম্পূর্ণরূপে সম্ভব। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের ঘটনাগুলো আমাদের জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা।

আসন্ন রবি মৌসুমে খাদ্য উৎপাদনে ধস এবং নতুন কোনো সামাজিক অসন্তোষ এড়াতে এখনই কাঠামোগত ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।

Related News

জীবনকালীন ভোগাধিকার আইন ও সামাজিক বাস্তবতার ভারসাম্য : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পিতা-মাতার ভোগাধিকার রক্ষা করে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাস এবং শরিয়াহ বিষয়ক বিতর্কের বিষয়ে উভয়পক্ষের নিরপেক্ষ মূল্যায়নধর্মী বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও জাতীয় আস্থার গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও জ্বালানি সংকট সমাধানের মহাপরিকল্পনার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকটে শত শত গাড়ির লংমার্চ বিরোধী দলের রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের চার বিভাগীয় লংমার্চের যৌক্তিকতা এবং চলমান জ্বালানি সংকটে সম্পদ সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বৈচিত্র্যময় শিল্প, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও কৌশলগত অর্থায়নের নতুন পথরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নে আইএসডিবির অর্থায়ন চুক্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ; ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনের তথ্য মতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতের সংকট, অনিয়ম ও সমাধানের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনে দূরীকরণে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে আগস্টে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার। আইন প্রয়োগ ও সুরক্ষার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী -ঐতিহ্য, সংহত অগ্রগতি ও ভবিষ্যতের রূপরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় উন্নয়ন, গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার বিশেষ সম্পাদকীয়।

গুমের অন্ধকার থেকে ন্যায়বিচারের পথে বাংলাদেশ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস, গুম তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট, তারেক রহমানের অনুভূতি এবং গুম প্রতিরোধ আইনের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search