বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
দেশীয় সার কারখানায় গ্যাস-সংকট, বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে করণীয় সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণমূলক সম্পাদকীয়।
জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিস্তারিত ও উন্মুক্ত আলোচনা দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল খাতটির প্রতি নীতিনির্ধারকদের গভীর উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ। বিগত সাড়ে ১৭ বছরের ভুল নীতি, অনিয়ম, মেগা প্রজেক্টকেন্দ্রিক লুটপাট এবং আমদানিনির্ভরতার যে জঞ্জাল রেখে যাওয়া হয়েছে, আজকের জাতীয় অর্থনীতি ও শিল্প খাত তার চরম মাসুল গুনছে। আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর অতি-নির্ভরতা, ক্যাপাসিটি চার্জের অশুভ বোঝা এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দেশীয় বিদ্যুৎ খাতকে এক ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল।
সংসদীয় আলোচনায় সরকারি দল কর্তৃক এ জাতীয় ভুলের স্বীকৃতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানিসংকটমুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্দেশ করা যেমন একটি ইতিবাচক আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ, তেমনই বিরোধী দলের উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবসমূহকে আমলে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে ‘নো পাওয়ার, নো মানি’ নীতির আওতায় নতুন রেন্টাল চুক্তি অনুমোদন করা হচ্ছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো অসম চুক্তিগুলোকে সামলানোর চেষ্টা চলছে। তবে অতীতকে দায়ী করার পাশাপাশি বর্তমান বাস্তবতায় কীভাবে শিল্পকারখানার চাকা সচল রাখা যায় এবং সাধারণ নাগরিককে চরম লোডশেডিং থেকে মুক্ত করা যায়, সেটাই সরকারের কার্যকারিতার আসল পরীক্ষা।
সরকার ঘোষিত ২০২৭ সালে কিছুটা স্বস্তি, ২০২৮ সালে আরও অগ্রগতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সংকটমুক্ত বাংলাদেশের রূপরেখা বা ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’ সময়োপযোগী। কিন্তু এটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।
বিগত দিনে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান না করে কেবল নির্দিষ্ট ‘টাইকুনদের’ সুবিধা দিতে এলএনজি টার্মিনালনির্ভর নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। সরকারের ঘোষিত ১৫০টি নতুন কূপ খননের উদ্যোগ এবং জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
আদানির মতো একপক্ষীয় এবং উচ্চ মূল্যের বিদেশি বিদ্যুতের চুক্তির আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে অভ্যন্তরীণ ফার্নেস ওয়েল, রামপালসহ অন্যান্য দেশীয় কেন্দ্রগুলোর দ্রুত পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কেবল সংসদে বিতর্ক নয়; বরং সংকট উত্তরণে বিরোধী দলের গঠনমূলক প্রস্তাবগুলোকে জাতীয় স্বার্থে গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট নিরসনে সরকারি ও বিরোধী দলের দক্ষ প্রতিনিধি এবং বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি ‘বিশেষ টাস্কফোর্স’ বা ‘সেল’ গঠন করা হলে তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনবে।
পূর্ববর্তী সরকারের সময় প্রণীত অন্যায় ক্যাপাসিটি চার্জ ও এলএনজি ক্রয়ের অনিয়ম অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে আইনি পর্যালোচনা করা এবং ভুতুড়ে বিল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।
জ্বালানি সংকট কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের সংকট নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও শিল্প প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার রাতে রাতারাতি সব সমাধান সম্ভব নয়—এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
জাতীয় সংসদে যে জাতীয় আলোচনার সূচনা হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে সরকারি ও বিরোধী পক্ষ একসাথে কাজ করলে এবং আমলানির্ভরতার বাইরে এসে জাতীয় সক্ষমতা (বাপেক্স) বৃদ্ধি করলে ২০৩০ সালের অনেক আগেই বাংলাদেশ টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।