জাতীয় সংসদে ‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন’ (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) গঠনের লক্ষ্যে বিল পাস হওয়া বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর ইতিহাসের অন্যতম একটি সংবেদনশীল ঘটনা। ২০০৩ সালে আত্মপ্রকাশের পর থেকে সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে র্যাব বিভিন্ন সময়ে সাফল্য দেখালেও, পরবর্তীতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মারাত্মক অভিযোগের মুখোমুখি হয়।
জাতিসংঘের সুপারিশ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অব্যাহত দাবির মুখে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী র্যাব বিলুপ্ত করার এই আইনি পদক্ষেপ মূলত একটি সংস্কার উদ্যোগ। তবে কেবল একটি নাম বা ‘সাইনবোর্ড’ পরিবর্তনের মাধ্যমে এই রূপান্তর সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এসআরবি প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার সুরক্ষায় জবাবদিহিমূলক একটি নতুন পেশাদার ইউনিটে পরিণত হবে—তাই নিয়ে ব্যাপক জনমত ও সংসদীয় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সংসদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের প্রধান সংশয় হলো—র্যাবের বিদ্যমান জনবল, অবকাঠামো, অস্ত্রশস্ত্র, ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব এবং এমনকি তদন্ত প্রক্রিয়া হুবহু নতুন এসআরবির কাছে স্থানান্তরিত হওয়ায় এটি “নতুন বোতলে পুরোনো মদ” হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিরোধীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্ব অপরিবর্তিত থাকলে নতুন বাহিনীর মোড়কেও পুরোনো বিতর্ক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
তবে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যুক্তি অত্যন্ত বাস্তবভিত্তিক; রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার বিপুল অস্ত্রশস্ত্র, আধুনিক ইকুইপমেন্ট ও ইন্টেলিজেন্স সম্পদ ধ্বংস না করে বা অপচয় না করে তা নতুন বিশেষায়িত ইউনিটের কাছে হস্তান্তরের আইনি প্রয়োজন রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধের পাশাপাশি এসআরবিকে সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ পুলিশের প্রশাসনিক কাঠামোর অধীন আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে।
এই নতুন আইনের মাধ্যমে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক যে দিকটি যুক্ত হয়েছে, তা হলো এসআরবির সদস্যদের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নেতৃত্বে “অভিযোগ প্রতিকার কমিটি” গঠনের বিধান।
এটি যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ ও সক্রিয় রাখা যায়, তবে তা অতীতে বাহিনীটির বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে সহায়ক হতে পারে। তবে একই সাথে নতুন এসআরবি ও এপিবিএন-কে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, নিজস্ব হাজতখানা ও তল্লাশির বিস্তৃত আইনি ক্ষমতা দেওয়ায় এদের কার্যক্রম যেন ক্ষমতার অপব্যবহার বা রাজনৈতিক নিপীড়নের নতুন হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কোনো এলিট বা বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের ভাবমূর্তি তার পোশাকে বা নামের বানানে থাকে না; তার ভাবমূর্তি নির্ভর করে আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ওপর। অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এসআরবি-র প্রশিক্ষণ, নিয়োগ পদ্ধতি এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে আমূল ও কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে।
শুধু র্যাবের নাম বিলুপ্ত করাই যথেষ্ট নয়; নতুন গঠিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কোনো পুরোনো অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং সুশাসন ও নাগরিক অধিকারের এক নতুন প্রতিরক্ষাব্যূহ।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।