আপত্তিকর ভিডিও ছড়ানোর পর মুখ খুললেন ‘জাকির’খ্যাত পাভেল
‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর জনপ্রিয় ‘জাকির’ চরিত্রের অভিনেতা সাইদুর রহমান পাভেলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিও নিয়ে নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন তিনি।
বিনোদন: ‘মুরব্বিরা যা বলে বুদ্ধিমানরা সেই মতোই চলে’, ‘মামা বলত ভাগনে বেশি লোভ করিসনে’, ‘আমার দুঃখ আছে কিন্তু কষ্ট নাই’—নব্বইয়ের দশক ও পরবর্তী সময়ের ঢালিউড দর্শকদের কাছে সংলাপগুলো এখনো পরিচিত। এসব সংলাপকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন খল অভিনেতা নাসির খান।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাঁচ শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করা এই অভিনেতার আজ জন্মদিন। ১৯৫৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় জন্ম তাঁর। ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি। নাসির খানকে ছাড়া তাঁর পরিবারের ১৯ বছর কেটে গেছে। তবে সময় পেরোলেও পরিবারের কাছে তাঁর অনুপস্থিতি এখনো গভীর।
পুরান ঢাকার বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনির পাশের একটি গলিতে ছিল নাসির খানের বাড়ি। এলাকায় তিনি ছিলেন পরিচিত ও প্রিয় মুখ। তাঁর মৃত্যুর পর সেই বাড়িতেই তিন মেয়েকে বড় করেছেন স্ত্রী মেহেরুন্নেসা স্বপ্না।
স্বামীর মৃত্যুর পর তিন মেয়েকে একাই বড় করেছেন মেহেরুন্নেসা স্বপ্না। পরিবারকে সামলানোর সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে ফিরে আসে দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতি।
মেহেরুন্নেসা বলেন, ‘তিন মেয়েকে বড় করা খুবই কঠিন ছিল। একাই তাঁদের মা–বাবার স্নেহ দিয়ে মানুষ করেছি। যখন যেভাবে পেরেছি, তাদের সেভাবে সবটা দিয়ে মানুষ করেছি, এখনো করছি।’
স্বামীর অনুপস্থিতিতে মেয়েদের জীবন হয়তো অন্য রকম হতে পারত বলেও মনে করেন তিনি। তবে বাবার আদর্শেই তাঁদের বড় করার চেষ্টা করেছেন।
তিনি জানান, দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে মহিমা খানম নিশিতা এখন ও–লেভেলে পড়ছে। সন্তানদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। পরিবারের জীবন এখন স্বাভাবিকভাবে চললেও নাসির খানের অভাব সব সময়ই অনুভূত হয়।
নাসির খানের তিন মেয়ে—নাছিমা খানম মমতা, ফাহিমা খানম শর্মিতা ও মহিমা খানম নিশিতা। বড় দুই মেয়ে বাবাকে কাছ থেকে পেয়েছেন। কিন্তু ছোট মেয়ে নিশিতা তখন মাত্র এক বছরের শিশু, যখন তাঁর বাবা মারা যান।
তাই বাবার সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই। অন্যদের কাছে বাবার গল্প শুনেই বড় হয়েছেন তিনি। টেলিভিশনে বাবাকে দেখলে এখনো মন খারাপ হয় তাঁর।
নিশিতা বলেন, ‘আমি অভিনেতা নাসির খানের মেয়ে—এই পরিচয়ে গর্বিত। বাবাকে মিস করি। হয়তো আজ বাবা বেঁচে থাকলে আমাদের জীবন অন্য রকম হতে পারত। বাবা আমাদের নিয়ে ঘুরতে যেতেন, বাবার আদর পেতাম।’
বাবা না থাকলেও বাইরে গেলে ভক্তদের ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করেন নিশিতা। নাসির খানের প্রতি দর্শকের এই ভালোবাসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতাও জানান তিনি।
বড় দুই মেয়ের স্মৃতিতে বাবার সঙ্গে কাটানো শৈশবের নানা মুহূর্ত এখনো স্পষ্ট। মেজ মেয়ে ফাহিমা খানম শর্মিতার মনে পড়ে, ব্যস্ততার মধ্যেও বাবা তাঁদের সময় দিতেন।
শর্মিতা বলেন, ‘বাবা অনেক ব্যস্ত থাকতেন। তারপরও আমাদের দুই বোনকে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতেন, পরীক্ষার হলে দিয়ে আসতেন। কখনো নিয়ে আসতেন। প্রতি শুক্রবার ঘুরতে নিয়ে যেতেন। কখনো দেশের বাইরে নিয়ে যেতেন। বাবার সঙ্গে আমাদের সময়গুলো অন্য রকম ছিল।’
বিশেষ দিনগুলোতে বাবার অনুপস্থিতি আরও বেশি অনুভব করেন শর্মিতা। তাঁর আক্ষেপ, বাবা বেঁচে থাকলে জন্মদিন ঘিরে পরিবারের আনন্দটাও হয়তো অন্য রকম হতো।
নাসির খান খলচরিত্রে অভিনয় করেই দর্শকের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, পর্দার সেই কঠোর চরিত্রের সঙ্গে বাস্তব জীবনের নাসির খানের কোনো মিল ছিল না।
শর্মিতা বলেন, ‘বাবা খলচরিত্রে অভিনয় করলেও বাস্তবে সহজ–সরল জীবন যাপন করতেন। শুটিং বলেন, আর এলাকার আত্মীয়স্বজনই বলেন, সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন।’
বাবার মৃত্যুর পরও তাঁর সম্পর্কে কারও কাছ থেকে খারাপ কথা শুনতে হয়নি বলেও জানান শর্মিতা। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাবার অভিনীত সিনেমা দেখলে পরিবারের সদস্যদের কাছে পুরোনো স্মৃতিগুলো ফিরে আসে।
নাসির খানের অভিনয়জীবন ছিল প্রায় ২৭ বছরের। ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘সাক্ষাৎ’, ‘বিক্ষোভ’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘গরিবের রাণী’সহ পাঁচ শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।
বিশেষ করে খলচরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মধ্যে আলাদা পরিচিতি তৈরি করে। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত বেশ কিছু সংলাপও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। এক–এগারোর পরের দিন হওয়ায় সেই সময় তাঁর মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছিল।
নাসির খানকে ঘিরে দর্শকদের স্মৃতি এখনো পুরোনো হয়নি। তাঁর অভিনীত সিনেমা ও সংলাপের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকের কাছেও তিনি পরিচিত।
তবে পরিবারের জন্য তাঁর স্মৃতি আরও ব্যক্তিগত। স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে তিনি শুধু চলচ্চিত্রের একজন জনপ্রিয় খল অভিনেতা নন, বরং একজন বাবা ও জীবনসঙ্গী।
নাসির খানের স্ত্রী জানান, চলচ্চিত্র অঙ্গনে এখন আগের মতো নিয়মিতভাবে তাঁকে স্মরণ করা হয় না। তবে পরিবার তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করে। এবারও দোয়া ও এতিমদের খাওয়ানোর আয়োজন করা হয়েছে।
১৯ বছর ধরে নাসির খান নেই। কিন্তু পুরান ঢাকার সেই বাড়ি, তাঁর অভিনীত সিনেমা, জনপ্রিয় সংলাপ আর তিন মেয়ের স্মৃতিতে তিনি এখনো জীবন্ত—একজন অভিনেতা হিসেবে দর্শকের কাছে, আর একজন বাবা হিসেবে পরিবারের কাছে।