কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া শিশু অপ্রতিমের নির্মম মরদেহ কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং গোটা জাতির বিবেককে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সাথে ছবি তুলতে বের হওয়া একটি নিষ্পাপ শিশুর এমন নৃশংস পরিণতি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও শিশু সুরক্ষার চরম ভঙ্গুর চিত্রকে আবার প্রকাশ্যে এনেছে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-১১) ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে ইতিমধ্যে এক কিশোর হেফাজতে আসলেও, এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের প্রধান দাবি।
অতীতের আছিয়া বা লামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বা বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। প্রতিটি শিশু হত্যার পর বিচার না হওয়া বা বিচারে দীর্ঘ বিলম্ব ঘটা সমাজে এক ধরনের বিচারহীনতার বার্তা পৌঁছায়।
দেশে শিশু হত্যা ও ধর্ষণের মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর নিয়মিত পুনরাবৃত্তি ঘটার মূল কারণ হলো সময়মতো বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া। আছিয়া বা লামিসার মতো নিষ্পাপ শিশুদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোতে সময়মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে।
দেশে শিশু হত্যা ও ধর্ষণের মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর নিয়মিত পুনরাবৃত্তি ঘটার মূল কারণ হলো সময়মতো বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া।
শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলোকে ন্যায়বিচার দিতে এবং অপরাধ প্রবণতা কমাতে ‘শিশু হত্যা ও ধর্ষণ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। একটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিচার সম্পন্ন হলে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই ঘটনার সাথে কিশোরদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তরুণ প্রজন্মের অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। কেবল একটি দামী ফোন বা সামান্য বস্তুগত প্রলোভনে পড়ে সহপাঠী বা বন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোর সমাজের গভীর নৈতিক ক্ষয় নির্দেশ করে।
একইসাথে সন্তানদের গতিবিধি, বন্ধুসঙ্গ এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিবিড় নজরদারি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
শিশু অপ্রতিম হত্যার প্রতিটি ক্লু দ্রুত উদ্ঘাটন করে এর সাথে জড়িত সকল অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আর কোনো মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়, তার জন্য রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ ও শঙ্কাহীন সমাজ গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।