শিশুদের গানের টানে লালমনিরহাটের নিভৃত গ্রামে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত
লালমনিরহাটের আদিতমারীতে শিশুদের লোকসংগীত ও লোকবাদ্যযন্ত্র চর্চা পরিদর্শন করলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত।
কুমিল্লা: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ নিহত শিশুটির বাবার মোবাইল সরঞ্জাম বিক্রির প্রতিষ্ঠানে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করতেন। ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে মাসিক ১৪ হাজার টাকা বেতনে তিনি কাজে যোগ দেন। তবে তখনও তাঁর সঙ্গে কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি।
অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার জানান, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটে তাঁর মোবাইল সরঞ্জামের শোরুম ‘ইয়েসটেক’। ফাহাদ তাঁর বাবা-মায়ের অনুরোধে গত ২ সেপ্টেম্বর সেখানে কাজে যোগ দেন। মাস শেষে তাঁর সঙ্গে চুক্তিপত্র করার পরিকল্পনা ছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার পর অপ্রতিম বাধা দিলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রথমে সাইফুল ইসলাম তুহিন, পরে ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসান বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন।
অপ্রতিমের বাবা বলেন, ফাহাদ ও তাঁর ছেলের মধ্যে তেমন কোনো বিরোধ বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না। অপ্রতিমও ফাহাদকে খারাপ মনে করত না। ফাহাদও চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর অপ্রতিম সম্পর্কে তাঁর কাছে কোনো নেতিবাচক কথা বলেননি।
তবে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা ধার নেওয়াকে ঘিরে আরেকটি বিরোধের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ফাহাদ অপ্রতিমের কাছ থেকে ওই টাকা ধার নিয়েছিলেন এবং সম্প্রতি তা ফেরত চাওয়া হচ্ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। বিষয়টি নিয়ে ফাহাদ ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতে পারেন—এমন সম্ভাবনাও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অপ্রতিমের বাবা জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। পরে মোবাইল বার্তা পাঠিয়ে তুহিন তাকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে যায় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
সন্ধ্যার পরও অপ্রতিম বাসায় না ফেরায় তাঁর বাবা ফাহাদকে ফোন করে ডেকে আনেন। নিখোঁজের বিষয়টি জানিয়ে তাকে খোঁজাখুঁজিতে সহায়তা করতে বলেন। ফাহাদ তখন তাদের ইন্টারনেট গ্রুপে অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার তথ্যও দেন।
পরিবারের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা তুহিনকে শনাক্ত করেন ফাহাদ। পরে তুহিনকে ফোন করে অপ্রতিম সম্পর্কে জানতে বলা হলে তুহিন তাকে অপ্রতিম তাঁর কাছে আসেনি বলে জানায়।
পরদিন সকালে তুহিন ও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার সিয়াম মোটরসাইকেলে করে অপ্রতিমের বাড়িতে যায় এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ফাহাদকেও ঘটনাস্থলে যেতে বললে তিনি শরীর খারাপের কথা বলে সরে যান।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান ২০ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দেখতে পায়, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সোয়া ৩টার দিকে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তুহিনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদকে এবং পরে ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তাঁর বাসা থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে সে বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল তার মাথায় বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করেন বলে পুলিশের দাবি। পরে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
অপ্রতিম হত্যা মামলায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসানকে (১৬) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া সিয়াম (১৯) নামে আরেকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বয়স কম হওয়ায় ফাহাদ ও কামরুলকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। চারজনকেই প্রাথমিকভাবে কুমিল্লা কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল ২০ সেপ্টেম্বর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বলে ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পুলিশ বলছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তির আবেদন করার কথাও জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।