ঢাকা: ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ, তাঁর স্ত্রী শাহেদা পারভিন সামিয়া এবং আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকার আদাবর থানায় সিআইডির আর্থিক অপরাধ ইউনিটের উপপরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মামলাটি করেন। সিআইডির আর্থিক অপরাধ বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সিআইডি জানিয়েছে, হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সালের অর্থের উৎস ও সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেশে-বিদেশে তাঁর সম্ভাব্য অবৈধ বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে তাঁর সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও অর্থপাচারের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ফয়সাল, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা মোট ৫৩টি ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যে জব্দ করেছে সিআইডি। এসব হিসাবের লেনদেন পর্যালোচনা করে অর্থের উৎস, স্থানান্তর ও ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং সেখানে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফয়সাল নিজের ও স্ত্রীর নামে থাকা ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে থাকা অর্থের উৎস গোপন করেছেন—এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর ফয়সাল তাঁর স্ত্রীর নামে ৬৫ লাখ টাকার একটি স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করেন।
সিআইডি ফয়সালের একটি ব্যাংক হিসাবের লেনদেনও বিশেষভাবে পর্যালোচনা করেছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একটি বেসরকারি ব্যাংকের রূপনগর শাখায় হিসাবটি খোলা হয়।
হিসাব খোলার সময় ব্যবসার ধরন হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি, পরামর্শসেবা ও প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করেন ফয়সাল। বছরে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা লেনদেন হবে বলে ঘোষণা দিলেও পরবর্তী দুই মাসে ওই হিসাবে মোট ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার লেনদেন হয়।
তদন্তকারীদের মতে, হিসাবটিতে নগদ টাকা উত্তোলন তুলনামূলক কম হলেও অর্থ পরিশোধ ও স্থানান্তরের পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। হিসাব খোলার সময় ঘোষিত ব্যবসার ধরন, লেনদেনের ধরন এবং ট্রেড লাইসেন্সে দেওয়া তথ্যের মধ্যেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইডির তদন্তে ফয়সালের মালিকানাধীন অ্যাপল সফট আইটি ও পিনাকল সলিউশন ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে একটি চুক্তির তথ্যও পাওয়া গেছে।
তদন্ত নথি অনুযায়ী, ফয়সালের প্রতিষ্ঠানটি পিনাকল সলিউশন ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যৌথভাবে তিনটি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল। পরবর্তী তদন্তে ওই প্রকল্পগুলোর দরপত্রের প্রস্তাব জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সিআইডি।
সিআইডির নথিতে বলা হয়েছে, যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলে ফয়সালের ব্যাংক হিসাবে ৫৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়েছিল। জাল দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
এ ছাড়া বাকিতে পণ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পাওনা অর্থ পরিশোধ না করার অভিযোগও তদন্তে এসেছে। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।
সিআইডির তদন্তে ফয়সালের সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাতায়াতের তথ্যও উঠে এসেছে। তাঁর একাধিকবার প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগসংবলিত পর্যটন ভিসা রয়েছে এবং ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশে ফেরেন।
বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাব জব্দের পর এখন বিদেশে ফয়সালের কোনো সম্পদ বা বিনিয়োগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করছে সিআইডি।
এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনও ফয়সালের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক মামলা করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিতি পান শরীফ ওসমান বিন হাদি। বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ, আন্দোলনে নিহত ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই ঘোষণাপত্রের দাবিতে সক্রিয় ছিলেন।
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন হাদি। ছয় দিন পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরে হত্যা মামলায় ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান আসামি করা হয়। বর্তমানে তিনি ভারতে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।