পিরোজপুর: পূর্বাকাশে সূর্যের আলো ফোটার আগেই পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বেলুয়া নদীতে দেখা মেলে সারি সারি নৌকার। কোনো নৌকায় শাকসবজি, কোনো নৌকায় কৃষিপণ্য, আবার কোনো নৌকাই যেন হয়ে ওঠে ভাসমান দোকান। নৌকা থেকে নৌকায় চলে দরদাম, কেনাবেচা। কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর বুকেই জমে ওঠে ব্যতিক্রমী এক বাজার।
এটি নাজিরপুরের বৈঠাকাটার ভাসমান হাট। সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত বসে এই হাট। স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা নৌকায় করে বিভিন্ন কৃষিপণ্য নিয়ে আসেন। আর পাইকাররা নৌকায় করেই এসব পণ্য কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যান।
স্থানীয়দের ভাষায়, জলপথনির্ভর এই বাজারের সঙ্গে ইতালির ভেনিস শহরের জলকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার মিল রয়েছে। এ কারণেই বৈঠাকাটা বাজার পরিচিতি পেয়েছে ‘বাংলার ভেনিস’ নামে।
ভাসমান এই হাটে প্রতি হাটে প্রায় কোটি টাকার কৃষিপণ্য কেনাবেচা হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। তরমুজের মৌসুমে বেচাকেনার পরিমাণ বেড়ে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত হয় বলে তাঁদের দাবি।
ভোর ৫টার দিকে শুরু হওয়া হাট চলে সকাল ১০টা পর্যন্ত। নাজিরপুর ছাড়াও নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা নৌকায় করে পণ্য নিয়ে আসেন।
হাটে শাকসবজি, বিভিন্ন ধরনের শস্য, ফলমূল, সবজির চারা, নারকেল ও তরমুজের পাশাপাশি কৃষিকাজে ব্যবহৃত শ্যাওলা ও দুলালী লতাসহ বিভিন্ন সামগ্রীও বিক্রি হয়। টাটকা পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় বলে ক্রেতাদেরও ভিড় থাকে।
বৈঠাকাটার ভাসমান হাটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের প্রধান বাহন নৌকা। কৃষকেরা নৌকায় করে পণ্য নিয়ে আসেন, আবার পাইকাররাও নৌকায় করেই পণ্য কিনে নিয়ে যান।
কৃষিপণ্য বিক্রেতা ৫৬ বছর বয়সী জালাল উদ্দিন বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই বাজারে ব্যবসা করতে আসেন। কৃষকেরা নৌকায় করে সবজি নিয়ে আসেন, আর পাইকাররা সেগুলো কিনে ট্রলারে করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যান।
ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির বলেন, ভাসমান এই হাটে কাঁচামালসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। তিনি এখান থেকে সবজি কিনে ট্রলারে করে নিজের এলাকার বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন।
বৈঠাকাটার হাটে শুধু প্রচলিত কৃষিপণ্যই নয়, কৃষিকাজে ব্যবহৃত নানা উপকরণও বিক্রি হয়। শ্যাওলা বিক্রি করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী রাজীব শেখ। তাঁর ভাষ্য, পার্শ্ববর্তী মোল্লারহাট এলাকা থেকে শ্যাওলা এনে তিনি বিক্রি করেন। শ্যাওলার কুরি প্রায় ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
কৃষক রুহুল আমিন নৌকা ভর্তি মিষ্টি কুমড়া নিয়ে এসেছিলেন হাটে। তিনি জানান, কয়েকজন ক্রেতা দাম বললেও ভালো দামের আশায় তিনি অপেক্ষা করছেন। এর আগের হাটে তিনি কচু নিয়ে এসেছিলেন।
বৈঠাকাটার ভাসমান হাট শুধু কৃষিপণ্যের বেচাকেনার কেন্দ্র নয়, পর্যটকদের কাছেও এটি আকর্ষণীয় স্থান। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকেরা এই ব্যতিক্রমী বাজার দেখতে আসেন। বিদেশি পর্যটকদেরও এখানে আসতে দেখা যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা জালিস হাওলাদার বলেন, ‘বাংলার ভেনিস’খ্যাত এই বাজার দেখতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসে। তবে পর্যটকদের জন্য যোগাযোগ ও আবাসন সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। রাস্তাঘাট ও আবাসনব্যবস্থা উন্নত করা হলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, ভাসমান এই হাটকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। নারকেল, তরমুজ, শাকসবজি, সবজির চারা, শ্যাওলা, দুলালী লতাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এখানে বিক্রি হয়। ভোরে এসে পাইকাররা কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যান।
বেলুয়া নদীর ওপর এই ভাসমান হাটকে কেন্দ্র করে বৈঠাকাটায় প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাজারও গড়ে উঠেছে। নদী, নৌকা ও কৃষিপণ্যের এই অনন্য সমন্বয় স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি পর্যটনেরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।