জাতীয়

ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণের পথ প্রশস্ত: অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে স্বস্তি নাকি দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি?

বাংলাদেশ ব্যাংকের একক ঋণগ্রহীতা সীমা শিথিল করার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি দেশের ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা এবং এলসি বা গ্যারান্টির মতো ‘নন-ফান্ডেড’ ঋণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি-ভার কমিয়ে আনা মূলত দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বড় শিল্প গ্রুপগুলোর তারল্য সংকট মোকাবিলার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমান বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলো তাদের নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের সংকটে ভুগছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই শিথিলতার ফলে ব্যাংকগুলো এখন তাদের বড় গ্রাহকদের বাড়তি অর্থায়ন করতে পারবে।

বিশেষ করে জ্বালানি, কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিকারকদের জন্য এটি বড় স্বস্তি নিয়ে আসবে। একক ঋণসীমা বাড়ার ফলে বড় বড় কলকারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা সহজ হবে, যা দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এছাড়া এলসির বিপরীতে ঝুঁকি-ভার কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনায় আমদানিকারকরা একই মূলধন ব্যবহার করে আগের চেয়ে বড় অংকের বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবেন, যা সরবরাহ শৃঙ্খল  সচল রাখতে সহায়ক হবে।

সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি উপেক্ষা করার মতো নয়। ব্যাংকিং খাতের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো ‘ঝুঁকি বণ্টন’। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে ঋণ বিতরণ না করে তা ছড়িয়ে দেওয়া। ঋণসীমা বাড়ানোর ফলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি একটি নির্দিষ্ট বা অল্প কয়েকটি বড় শিল্প গ্রুপের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়বে। যদি কোনো কারণে ওই বড় গ্রুপটি ব্যবসায়িক সংকটে পড়ে বা ঋণখেলাপি হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এটি সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হতে পারে।

এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) জন্য ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়ার একটি আশঙ্কা থাকে, কারণ ব্যাংকগুলো তখন বড় গ্রাহকদের পেছনেই তাদের ঋণের সক্ষমতা বেশি ব্যবহার করতে আগ্রহী হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই শিথিলতা ২০২৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত কার্যকর রাখা হয়েছে। এটি মূলত একটি সাময়িক প্রশমন হিসেবে কাজ করবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এই বাড়তি ঋণের যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংকগুলো যেন কেবল বড় গ্রাহকদের তুষ্ট করতেই তাদের সমুদয় মূলধন ব্যয় না করে, সেদিকে কড়া নজরদারি রাখতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। ঋণ মঞ্জুরির ক্ষেত্রে কঠোর ক্রেডিট রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (CRA) বা ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়।

পরিশেষে বলা যায়, শিল্প খাতের চাকা সচল রাখতে এবং ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয় সামাল দিতে এই নীতিগত পরিবর্তন বর্তমান সময়ের জন্য কার্যকর মনে হতে পারে। তবে বড় গ্রুপের হাতে ঋণের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ যেন সাধারণ আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকাই হবে আগামীর মূল চ্যালেঞ্জ।

স্বচ্ছতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এই শিথিলতা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে, অন্যথায় এটি ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

ইশতেহার থেকে বাস্তবতা: তারেক রহমানের নতুন সংগ্রামের ডাক ও আগামীর বাংলাদেশ

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে জয়লাভ করা কেবল একটি যাত্রার শুরু, গন্তব্য নয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে…

ইতিহাসের দর্পণ ‘জুলাই জাদুঘর’: ফ্যাসিবাদের পতন ও আগামীর গণতান্ত্রিক পথের আলোকবর্তিকা

একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাস যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তখন তা কেবল অতীতের স্মৃতি থাকে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে…

আশার আলোয় উত্তরবঙ্গ: তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ ও বঞ্চনার নাম তিস্তা নদী। বর্ষায় ভাঙন আর শুষ্ক মৌসুমে মরুকরণ—এই দুই চক্রব্যুহ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’

স্বাস্থ্য খাতে জনস্বার্থের জয়: পড়ে থাকা ৬ শিশু হাসপাতালসহ সব বিশেষায়িত হাসপাতাল চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অব্যবহৃত স্বাস্থ্য অবকাঠামো সচলকরণ এবং দেশের চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক নির্দেশনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বছরের পর বছর ধরে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিশাল সব ভবন জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে পড়ে থাকা কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই নয়, বরং সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।

গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও নাগরিক নিরাপত্তা: পুলিশি সংস্কার ও কার্যকর ভূমিকার নবদিগন্ত

দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং স্বৈরশাসনের অবসানের পর বাংলাদেশে এখন এক নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের মূল…

ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা ব্যর্থ: ট্রাম্পের নীরবতায় যুদ্ধের শঙ্কা

২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পর কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি বৈঠক। যুদ্ধবিরতির ১০ দিন বাকি থাকতেই ট্রাম্পের নীরবতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ।

ইরানের ওপর নৌ অবরোধের ইঙ্গিত দিলেন

ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরানের ওপর নৌ অবরোধের ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে শেয়ার করা প্রতিবেদনের বিস্তারিত জানুন।

জ্বালানি সরবরাহে চালু হচ্ছে ‘ফুয়েল অ্যাপ’: ডা. জাহেদ উর রহমান

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানির বড় কোনো সংকট নেই। পাচার রোধে অভিযান ও ‘ফুয়েল অ্যাপ’ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। বকেয়া ও ভর্তুকির বিস্তারিত তথ্য জানুন।

Search