স্বর্ণ ও রুপার দামে বড় সংশোধন
রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর স্বর্ণ ও রুপার দামে বড় পতন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান শর্ত হলো স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং বিশ্ববাজারের নানামুখী চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আগামী বাজেট প্রণয়ন বর্তমান সরকারের জন্য এক বিরাট পরীক্ষা। এফডিসিতে ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত প্রাক-বাজেট ছায়া সংসদে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্য দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের ভবিষ্যৎ নীতিমালার একটি বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরেছে।
বিগত সরকারের অন্যতম বড় নেতিবাচক দিক ছিল পরিসংখ্যান ও তথ্যের জালিয়াতি। ধমকা-ধমকি এবং কৃত্রিম ডেটা বা তথ্যের মাধ্যমে উন্নয়নের যে মরীচিকা তৈরি করা হয়েছিল, তার খেসারত দিতে হচ্ছে বর্তমান অর্থনীতিকে। উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ঘোষণা করেছেন যে, বর্তমান সরকার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সব তথ্য জনগণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখবে।
তথ্যের এই স্বচ্ছতা কেবল সুশাসন নিশ্চিত করবে না, বরং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিগত সরকারের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করে অর্থনীতির ‘গণতন্ত্রায়ণ’ করার যে প্রত্যয় তিনি ব্যক্ত করেছেন, তা আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।
বাজারে কৃত্রিমভাবে টাকা ছাপিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার যে অপপ্রচার চলছে, উপদেষ্টা তাকে ‘গালগল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। বাস্তবে সরকার এই মুহূর্তে উৎপাদনশীল খাত, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর মাধ্যমে প্রকৃত অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
বিগত দিনে ব্যবসায়ীরা যে পুঁজি সংকটে ভুগেছেন, তা কাটিয়ে উঠতে ঋণ প্রবাহ সচল করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে গুটিকয়েক কোম্পানির সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কোনো খাতকেই আর ইজারা বা সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে না দেওয়ার এই নীতি সাধারণ ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই স্বস্তিদায়ক।
বিগত সময়ে আয় ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতার কারণে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজে যে বড় ধরনের ভাঙন ধরেছে, তা অত্যন্ত মর্মান্তিক বাস্তব চিত্র। ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির সাথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের আমদানিনির্ভর বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
তাই এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় ও প্রধান পরীক্ষা হবে এই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা।
আসন্ন বাজেটে সরকারকে কেবল অবকাঠামোগত গালভরা উন্নয়নের দিকে না তাকিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) জোরদার করার দিকে নজর দিতে হবে। নিম্নআয়ের ও দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য বিশেষ খাদ্য ও পণ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্ধ শিল্পকারখানা সচল করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
ছায়া সংসদে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরাজিত করে জাতীয় বস্ত্র প্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (নিটার) বিতার্কিকদের বিজয় মূলত তরুণ প্রজন্মের এই যৌক্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনারই প্রতিফলন।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। ঋণ করে লুটপাটের যে সংস্কৃতি বিগত আমলে তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বের হয়ে এসে একটি স্বনির্ভর ও স্বচ্ছ অর্থনীতি গড়ে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য। আসন্ন বাজেটে যদি কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সিন্ডিকেট দমন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, তবেই জনগণের সম্পৃক্ততায় অর্থনীতির প্রকৃত গণতন্ত্রায়ণ সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশ একটি সুসংহত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।