বাংলাদেশ নদীমাতৃক এবং কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের ভারসাম্য সরাসরি পানির উৎস এবং জলাশয়গুলোর নাব্যতার ওপর নির্ভরশীল। গত শনিবার (১৬ মে ২০২৬) চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার টামটা দক্ষিণ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ‘খোর্দ্দ খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশব্যাপী নদী-নালা ও খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছেন। এই উদ্যোগটি কেবল নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সুষম ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার এক দূরদর্শী পদক্ষেপ।
বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে খাল খনন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার ইতিহাসের সাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
স্বাধীনতার পর দেশের খাদ্য ঘাটতি দূর করতে এবং কৃষিতে বিপ্লব ঘটাতে ১৯৭৭-৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশব্যাপী ‘স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খনন কর্মসূচি’ শুরু করেছিলেন। এটি ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সফল একটি গণমুখী আন্দোলন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ‘খোর্দ্দ খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেছেন, প্রায় ৪৮ বছর আগে ১৯৭৭-৭৮ সালে জিয়াউর রহমান নিজেও এই খোর্দ্দ খাল খনন কার্যক্রমে সশরীরে অংশ নিয়েছিলেন। ইতিহাস যেন আজ তার নিজ কক্ষপথে আবর্তিত হয়ে পিতার সেই অসমাপ্ত এবং ঐতিহ্যবাহী জনকল্যাণমূলক কাজকে পুত্রের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করল।
বিএনপি সব সময়ই গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। অতীতেও দলটির শাসনামলে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান সময়ে খাল খনন কেন অপরিহার্য?
একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাস্তবতায় খাল খনন ও পুনঃখনন কেবল প্রয়োজনীয়ই নয়, বরং টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- ১. জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বাংলাদেশে এখন অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র খরা এবং অসময়ে বন্যা দেখা দিচ্ছে। খাল-নালাগুলো খনন করা থাকলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সহজে নেমে যেতে পারে, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে। আবার শুষ্ক মৌসুমে এই সংরক্ষিত পানি খরার প্রকোপ কমায়।
- ২. ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো: বর্তমানে দেশের কৃষিকাজ এবং সেচ ব্যবস্থা অতিরিক্ত মাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানির (Underground Water) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক। খাল খনন করলে বৃষ্টির পানি বা নদীর উদ্বৃত্ত পানি জমিয়ে রেখে ভূ-উপরিস্থ পানির (Surface Water) ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।
- ৩. কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা: নাব্যতা হারানো খালগুলো পুনরায় খনন করলে লাখ লাখ হেক্টর জমি নতুন করে সেচ সুবিধার আওতায় আসবে, যা ফসলের উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
- ৪. মৎস্য চাষ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা: খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় দেশীয় প্রজাতির সুস্বাদু মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির পথে। খাল পুনঃখনন গ্রামীণ মৎস্য চাষের বিকাশ ঘটাবে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আমিষের চাহিদা পূরণ করবে।
নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকার দেশের জলাধারগুলো সংরক্ষণ এবং পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। চাঁদপুরের শাহরাস্তির খোর্দ্দ খাল পুনঃখননের মাধ্যমে সেই মহাপরিকল্পনার বাস্তব রূপায়ণ শুরু হলো।
শাহরাস্তির এই সাড়ে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ খোর্দ্দ খাল পুনঃখনন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২৪১ হেক্টর কৃষিজমি নতুন প্রাণ ফিরে পাবে। এর ফলে সরাসরি ২ হাজার ৭৮৮টি কৃষক পরিবার সেচ সুবিধা পাবে এবং মৎস্য চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
চাঁদপুরেই শুধু নয়, পর্যায়ক্রমে চাঁদপুর সদর উপজেলার ঘোষেরহাট বিশ্বখালসহ দেশব্যাপী প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় স্থানীয় নদী ও প্রধান খালগুলো ড্রেজিং এবং পুনঃখনন করা হবে।
সরকার এই কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে চায়। এর মাধ্যমে গ্রামীण পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক কুটির শিল্প ও মৎস্য খাতের এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী ‘খাল খনন’ কর্মসূচির ৪৮ বছর পর, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে এর পুনঃসূচনা বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী। এটি কেবল গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করবে না, বরং জলবায়ু সহনশীল একটি সুসংহত বাংলাদেশ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দ্রুত একটি স্বনির্ভর ও টেকসই অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।