বাংলাদেশের ভৌগোলিক মানচিত্র এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। বিগত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত অববাহিকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) যেভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক অবৈধ পুশইনের অপচেষ্টা চালিয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। তবে উদ্বেগের এই মেঘ কেটে গেছে আমাদের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর অকুতোভয় পেশাদারিত্ব এবং সীমান্তবাসীর অতন্দ্র প্রহরার যৌথ শক্তির কাছে।
মেহেরপুরের গাংনী, কুষ্টিয়া, লালমনিরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, হিলি, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, সিলেট এবং শেরপুর সীমান্তে বিএসএফ-এর পুশইনের প্রতিটি সুসংগঠিত চেষ্টা যেভাবে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে, তা এক নতুন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।
সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ তথ্যানুযায়ী, বিএসএফ এবং ভারতীয় পুলিশ ওপার থেকে সুপরিকল্পিতভাবে নারী, পুরুষ ও শিশুদের বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে জড়ো করে রাতের অন্ধকারে বা সুযোগ বুঝে কাঁটাতারের গেট খুলে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। লালমনিরহাট সীমান্ত থেকে ৩২ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ২৮ জন, গাংনী থেকে ৭ জন এবং পাটগ্রাম থেকে ১০ জনকে পুশইন করতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেদনার ও অমানবিক চিত্র দেখা গেছে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে এবং পঞ্চগড় সীমান্তে। সেখানে নিরীহ নারী, শিশু এবং এমনকি একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ বেশ কিছু মানুষকে শূন্য রেখায় (জিরো পয়েন্ট) খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখা হয়েছে, যেখানে তৃষ্ণার্ত শিশুরা ভুট্টা ক্ষেতের নোংরা পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে। পুশইনের মতো একটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও জোরপূর্বক প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে ভারত সরকার যে চরম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, জিরো লাইনের এই মানবিক সংকট তারই প্রমাণ।
এবারের পুশইন প্রতিরোধের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিক হলো—সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন সাধারণ জনগণ। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও শেরপুর সীমান্তে গভীর রাতে বা জুমার নামাজের মতো সংবেদনশীল সময়েও স্থানীয় গ্রামবাসীরা সংঘটিত হয়ে বিজিবির সাথে পালাক্রমে পাহারায় অংশ নিচ্ছেন। দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে বিজিবির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে রাত-দিন দায়িত্ব পালন করছেন গ্রাম পুলিশ সদস্যরা।
৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি এবং ৪৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হকের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দেশপ্রেমের এই অনন্য নজির বিজিবিকে মাঠে ‘ইস্পাতকঠিন’ অবস্থান ধরে রাখতে বিপুল মনস্তাত্ত্বিক শক্তি জুগিয়েছে। সিলেট সীমান্তে মাইকিং করে জনগণকে সচেতন করা এবং শেরপুরে মানব পাচারকারী চক্রের অপচেষ্টা রুখে দেওয়া প্রমাণ করে, দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় আজ রাষ্ট্র ও জনগণ এক সমান্তরালে অবস্থান করছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র নীতি—“বাংলাদেশ প্রথম”—এর সফল ও দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটছে দেশের প্রতিটি বর্ডারে। অতীতে যেখানে পুশইন বা সীমান্ত হত্যা নিয়ে এক ধরনের নতজানু বা ঢিলেঢালা ভাব লক্ষ্য করা যেত, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে সেই সমীকরণ আমূল বদলে গেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বিজিবিকে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা দেওয়া হয়েছে—সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের চেষ্টা সফল হতে দেওয়া যাবে না। এর ফলে বিজিবি সদস্যরা কোনো ধরনের দ্বিধা না রেখে তাৎক্ষণিক কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের “সীমান্তের বাইরে বন্ধু, কোনো প্রভু নয়” নীতির আলোকে বাংলাদেশ এখন সমমর্যাদার ভিত্তিতে বিএসএফ-এর এই অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে।
সীমান্তে অপরাধ ও অনুপ্রবেশ দমনে স্থানীয় প্রশাসন, গ্রাম পুলিশ এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বয়ে ‘কমিউনিটি ওয়াচ’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যার সুফল এখন বর্ডারে দেখা যাচ্ছে।
একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র কখনোই তার সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশের চাপিয়ে দেওয়া সংকট বা জনসংখ্যা নিজের ঘাড়ে নেবে না। বিএসএফ-এর পুশইনের অপচেষ্টা যেভাবে বাংলাদেশের বিজিবি ও বীর জনতা সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করেছে, তা আমাদের জাতীয় ঐক্যের এক পরম স্মারক। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এই কঠোর ও আপসহীন অবস্থান বজায় রাখবে।
পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারতের এই পুশইন নীতি ও জিরো পয়েন্টে সৃষ্টি করা অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে জোরালো আইনি ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।
লেখক: আতাউর রহমান মিন্টু, সম্পাদক ও প্রকাশক।