সম্পাদকীয়

স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ ও আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগ: ইসির নতুন আচরণ বিধি

বাংলাদেশের তৃণমূল রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত এই নির্বাচনগুলোকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকে তুঙ্গে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক স্থানীয় সরকারের সব স্তরের (ইউপি, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশন) নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার খসড়া অনুমোদন এবং তা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে মতামতের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তবে এই খসড়া নীতিমালার সবচেয়ে আলোচিত দিকটি হলো—কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকাতে ‘অঙ্গীকারনামা’ যুক্ত করার পূর্ববর্তী বিতর্কিত উদ্যোগ থেকে ইসির চূড়ান্তভাবে সরে আসা। একই সাথে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রচারণার অংশ হিসেবে পোস্টার নিষিদ্ধ করার মতো বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তও এই খসড়ায় স্থান পেয়েছে, যা আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ও আচরণ বিধিমালায় কঠোর সংশোধনী এনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর জন্য বিশেষ অঙ্গীকারনামার বিধান যুক্ত করেছিল ইসি। ঠিক একই আদলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের খসড়াতেও এই বিধান রাখার একটি প্রস্তাব ইসি কর্মকর্তারা করেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর ইসি যে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে, তা অত্যন্ত যৌক্তিক ও আইনসম্মত।

ইসির কর্মকর্তারা ঠিকই ধরেছেন যে—স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো মূলত নির্দলীয় বা প্রতীকহীন (স্বতন্ত্র) ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একটি নির্দলীয় নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা দল নিষিদ্ধ থাকার অজুহাতে মৌলিক নাগরিক অধিকার তথা ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার’ থেকে কাউকে বঞ্চিত করা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

ইসি যদি জোর করে অঙ্গীকারনামা যুক্ত করত, তবে তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত এবং নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। এই পিছুটান আসলে কোনো রাজনৈতিক আপস নয়, বরং আইনি বাস্তবতারই জয়। এর ফলে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও নির্দলীয় ব্যানারে তাদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের আইনি সুযোগ লাভ করলেন, যা নির্বাচনকে আরও বেশি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলবে।

খসড়া আচরণ বিধিমালার সবচেয়ে প্রগতিশীল ও যুগান্তকারী দিক হলো—নির্বাচনে সনাতন কাগজের পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনী পোস্টার আর লেমিনেটিং প্লাস্টিকের কারণে দেশের শহর ও গ্রামগুলো যেভাবে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হতো এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হতো, তা বন্ধে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

নতুন খসড়া অনুযায়ী, প্রার্থীরা এখন থেকে বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন এবং ব্যাপক আকারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন। এছাড়া ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনে আধুনিক পদ্ধতিতে প্রচারের সুযোগ এবং দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এটি একদিকে যেমন নির্বাচনী ব্যয় বহুগুণ কমিয়ে আনবে, অন্যদিকে শব্দদূষণ ও পরিবেশ দূষণ থেকে সাধারণ মানুষকে দেবে মুক্তি।

তবে ডিজিটাল মাধ্যমে যেন কোনো ধরনের নোংরা অপপ্রচার বা গুজব না ছড়ায়, সেদিকেও বিটিআরসি ও সাইবার নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

খসড়া নীতিমালায় প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হলো—জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আদলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে সরাসরি প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতা নিজেদের হাতে রেখেছে ইসি। অতীতে দেখা গেছে, স্থানীয় নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের প্রভাব বা পেশিশক্তির জোরে আচরণ বিধি ভাঙার মহোৎসব চলত এবং ইসি কেবল নামমাত্র জরিমানা করেই খালাস পেত।

এবার সরাসরি প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর চাবুক হাতে রাখায় প্রার্থীরা ভোটের মাঠে নিয়মের মধ্যে থাকতে বাধ্য হবেন।

ইসি আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে এই খসড়ার ওপর মতামত দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। আমরা আশা করব, দলগুলো কেবল রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব না করে, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক করতে গঠনমূলক মতামত দেবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন যে স্বাতন্ত্র্য ও সাহসিকতা দেখাচ্ছে, এই খসড়া আচরণ বিধিমালা তারই প্রমাণ। তৃণমূলের নির্বাচনকে সম্পূর্ণ নির্দলীয়, অংশগ্রহণমূলক এবং পরিবেশবান্ধব করার এই উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইসি যদি পেশিশক্তি ও কালো টাকার ব্যবহার কঠোরভাবে দমন করতে পারে, তবে ২০২৬ সালের এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেশের ইতিহাসে একটি রোল মডেল হয়ে থাকবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ: সাইবার নিরাপত্তায় লাল সংকেত নাকি সময়োচিত সতর্কতা? -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধের নেপথ্য কারণ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা-বাগেরহাট সফর সম্পন্ন; আঞ্চলিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সমাপ্তি, মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মোংলা থেকে উপকূলের জাগরণ — প্রধানমন্ত্রীর সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন সফর নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণাত্মক কলাম।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার — সম্প্রীতির বাংলাদেশ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

মহানবমীতে তিন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক পূজা মণ্ডপ সফর ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

নাগরিকত্বই পরিচয়, ধর্ম নয় – তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের বার্তা। -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর দুর্গোৎসব সফর, সেনাবাহিনীতে ওআরওপি সুবিধা এবং বর্তমান রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাই আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের তাৎপর্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার দিক নির্দেশনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিন আজ, ২০২৭ সালের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান

থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা শেষ। ২০২৭ সালের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান। ব্যাংকক থেকে রিপোর্ট।

ব্যাংককে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিগন্ত: সংস্কারের শর্তে বাংলাদেশের সামনে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ-রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সম্মেলনে বাংলাদেশের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search