শোক সংবাদ: এক রত্নগর্ভা মাতার বিদায় ও অপূরণীয় ক্ষতি
‘জীবন স্রোত’ সম্পাদক ডাক্তার বদরুজ্জামান ও দৈনিক ‘শব্দ মিছিল’ সম্পাদক মোল্লা আতাউর রহমান মিন্টুর মাতা কুলসুম বেগমের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ ও শোক সম্পাদকীয়
একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হলো তার ব্যাংকিং খাত। কিন্তু বিগত দেড় দশক ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট, ঋণ জালিয়াতি এবং প্রভাবশালী মহলের বেনামি ঋণের সংস্কৃতির কারণে দেশের সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। এই প্রেক্ষাপটে, মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ রবিউল বাশারের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আদালতের মাধ্যমে সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করার এই খতিয়ান প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার কেবল মুখের কথায় নয়, বরং বাস্তবেও ‘আর্থিক খাতের অপরাধীদের’ শিকড় উপড়ে ফেলতে বদ্ধপরিকর।
অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, যারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের জন্য যেমন ‘বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৭/২০২৫’-এর মাধ্যমে নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে; তেমনি যারা ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে ‘ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধন) আইন’ অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
যেসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের হার বিপজ্জনক পর্যায়ে, তাদের জন্য ‘রেজোল্যুশন স্ট্র্যাটেজি’ বা বিশেষ গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলোর কারণে প্রভাবশালী মহলের ব্যাংক লুটের চিরাচরিত সংস্কৃতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, যা আমানতকারীদের মনে তাদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করেছে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান সরকার এই প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের একটি শক্তিশালী আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এই টাস্কফোর্সের অধীনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল মাঠপর্যায়ে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে।
জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় চিহ্নিত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলার মাধ্যমে গত এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে, তা নিচে দেওয়া হলো:
বিদেশে বাংলাদেশের সম্পদ অবরুদ্ধ করার এই আইনি বিজয় বিশ্বমঞ্চে আমাদের সার্বভৌম আইনি সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে দায়ের হওয়া ১৪২টি মামলার মধ্যে ইতিমধ্যে ১৬টি মামলায় চার্জশিট দাখিল এবং ৬টি মামলার রায় ঘোষণা হওয়া প্রমাণ করে যে, বিচার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
অর্থ পাচার রোধে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অধীনে নবগঠিত ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন’ একটি অসামান্য ও দূরদর্শী উদ্যোগ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর আদলে গঠিত এই বিশেষায়িত বিভাগটি আন্তর্জাতিক অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয় করে লুণ্ঠিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ফিরিয়ে আনতে বৈজ্ঞানিক ও আইনি অনুসন্ধান চালাবে।
সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া এই তথ্যগুলো নিঃসন্দেহে দেশের ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের হারিয়ে যাওয়া আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে। তবে এই অবরুদ্ধ সম্পদগুলোকে চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ক্যাশ বা তরল অর্থ হিসেবে ফেরত আনা এবং খেলাপি ঋণের সামগ্রিক গ্রাফকে এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনাই হবে আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ।
আর্থিক খাতের এই শুদ্ধি অভিযান প্রমাণ করে যে, সুশাসন নিশ্চিত করার সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো বড় সিন্ডিকেটকেই ভেঙে দেওয়া সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের “বাংলাদেশ প্রথম” নীতির আলোকেই দেশের অর্থ দেশের ভেতরে রাখার এবং লুণ্ঠিত অর্থ ফিরিয়ে আনার এই মহৎ লড়াই বেগবান হয়েছে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক