স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ ও আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগ: ইসির নতুন আচরণ বিধি
ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ করে নতুন আচরণ বিধিমালার খসড়া অনুমোদন দিল নির্বাচন কমিশন। আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত
নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি, ডলার বাজারের অস্থিরতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ঘোষিত হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন জাতীয় বাজেট। এই বাজেটটি কেবল একটি চিরাচরিত বার্ষিক আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, বরং এটি ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার এক মহাপরিকল্পনা।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী যে বাজেটটি জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন, তার মূল দর্শন—“অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং লুণ্ঠিত খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।” বিশাল অঙ্কের এই বাজেটে একদিকে যেমন নবম জাতীয় পে-স্কেলের মতো জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের প্রতিফলন রয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের কঠিন লক্ষ্যমাত্রা ও ঘাটতি অর্থায়নের মতো কিছু বাস্তব সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপও দৃশ্যমান।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো দেশের ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখা। সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের এই সিদ্ধান্ত বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে মধ্য ও নিম্ন আয়ের চাকুরিজীবীদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি।
একই সাথে, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে বাজেটে যে সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বিএফআইইউ-এর অধীনে নবগঠিত ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন’ এবং কর ফাঁকি রোধে এনসিবি ও সিআইডির সমন্বিত যৌথ টাস্কফোর্সের ঘোষণা প্রমাণ করে যে, সরকার আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে শতভাগ আপসহীন।
এছাড়া, তরুণদের জন্য জাতীয় পর্যায়ের স্টার্টআপ তহবিল, সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রামে বিশেষ বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্তটি দেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও মেধানির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে দারুণ ভূমিকা রাখবে।
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে দেশের সাধারণ মানুষের প্রধান শত্রু—মূল্যস্ফীতি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণ করা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দামের তারতম্যের পাশাপাশি দেশের ভেতরের অসাধু বাজার সিন্ডিকেটগুলোর কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত।
বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি ও টিসিবির মাধ্যমে কম মূল্যে খাদ্য বিতরণের বরাদ্দ বাড়ানো হলেও, তা বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় এখনো সীমিত। নতুন পে-স্কেল চালুর কারণে বাজারে যেন নতুন করে ‘কৃত্রিম মূল্যস্ফীতি’ তৈরি না হয় এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন চাল, ডাল, তেলের দাম বাড়িয়ে কর্মচারীদের বাড়তি বেতন লুটে নিতে না পারে, সেদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বাজেট বাস্তবায়নের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজারের ওপর সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
নতুন বাজেটে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস‘ ও কারিগরি শিক্ষাসহ চারটি নতুন বাধ্যতামূলক বিষয় চালুর জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে অবদান রাখবে। তবে ইউনেস্কোর মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির যে অনুপাত থাকা উচিত, বাংলাদেশ এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে কিছুটা পিছিয়ে। আমরা আশা করব, ২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রম যখন পুরোদমে চালু হবে, তখন শিক্ষা খাতে বরাদ্দের গ্রাফটি আরও উর্ধমুখী হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের “দেশ ও জনগণের সমৃদ্ধি” নীতির ওপর ভিত্তি করে প্রণীত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষত মেরামতের একটি চমৎকার আইনি ও প্রশাসনিক দলিল। তবে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে এর বাস্তবায়নের ওপর। করের বোঝা যেন সাধারণ মধ্যবিত্তের ওপর না চেপে বড় বড় খেলাপি ও কর ফাঁকিবাজদের ওপর চাবুক হিসেবে কাজ করে, রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।