টানা রপ্তানি পতন ও তৈরি পোশাক খাতের সংকট: অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই
দেশের রপ্তানি আয় ও তৈরি পোশাক খাতে ধারাবাহিক পতন নিয়ে উদ্বেগ। ২০২৬ সালের মে মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৭.০৯%। সিপিডি ও বিকেএমইএ-র বিশ্লেষণসহ বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
একটি দেশের আকাশসীমা কেবল ভৌগোলিক সীমানা নয়, এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সার্বভৌমত্বের অন্যতম প্রধান প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের আকাশসীমার, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলের একটি বড় অংশ কার্যকর নজরদারির বাইরে ছিল।
ফলে বহু বিদেশি উড়োজাহাজ আমাদের আকাশসীমা ব্যবহার করলেও তাদের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক বিধান অনুযায়ী প্রাপ্য ‘ফ্লাইং ওভার চার্জ’ বা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হতো না। তবে বিগত ২০ এপ্রিল বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এটিসি টাওয়ার ও অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেমের উদ্বোধনের মাধ্যমে সেই পুরোনো ও সীমিত সক্ষমতার যুগের অবসান ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই এটিএম-সিএনএস সিস্টেম প্রকল্পটি দেশের বিমান চলাচল খাতকে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
নতুন এটিসি টাওয়ার ও রাডার সিস্টেম পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর থেকেই দেশের রাজকোষে ফ্লাইং ওভার চার্জ বাবদ রাজস্ব আদায়ে যে অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা এক কথায় চোখ ধাঁধানো। বেবিচকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ:
ত্রৈমাসিক আয়ের চিত্র: ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) এ খাতে আয় হয়েছিল যেখানে ১৫৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। আর নতুন এটিসি টাওয়ারের পূর্ণাঙ্গ সুফলে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই এই আয় রেকর্ড ১৯৯ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮১০ টাকায় পৌঁছেছে।
জানুয়ারি মাসের তুলনামূলক প্রবৃদ্ধি: ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আয় ছিল ৫৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, ২০২৫-এ তা বেড়ে হয় ৬৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা এক লাফে ৮০ কোটি ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৬ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ, দুই বছরের ব্যবধানে শুধু জানুয়ারি মাসেই অতিরিক্ত রাজস্ব এসেছে ২৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
ফেব্রুয়ারি ও মার্চের ধারাবাহিকতা: ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকার আয় দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ২২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় ঠেকেছে। একইভাবে মার্চের আয়ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলতি বছরে ৬২ কোটি ১৭ লাখ টাকা পার করেছে।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন কীভাবে একটি অবহেলিত খাতকে রাতারাতি দেশের অন্যতম লাভজনক অর্থনৈতিক নিয়ামকে পরিণত করতে পারে।
ফ্রান্সের বিশ্ববিখ্যাত থ্যালেস কোম্পানির জিপ্লান অনুযায়ী স্থাপিত এই নতুন প্রযুক্তির সক্ষমতা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এর আওতায় থাকা এস-ব্যান্ড প্রাইমারি রাডার ৮০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এবং মোড-এস সেকেন্ডারি সার্ভেল্যান্স রাডার ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত দেশের সমগ্র আকাশসীমাকে নিশ্ছিদ্র কভারেজ প্রদান করছে। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ এবং বেবিচকের জনসংযোগ কর্মকর্তা কাওছার মাহমুদের ভাষ্যমতে, এখন রাডার এড়িয়ে কোনো বিদেশি ফ্লাইটের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ নেই। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা এখন রিয়েল-টাইম তথ্য পাচ্ছেন, যা বিমান চলাচলের নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ফ্লাইট পরিচালনাকে করেছে অধিকতর সুশৃঙ্খল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দেশের বিমান ও পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে যে সব যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে, এই রাডার প্রকল্প তারই একটি অংশ।
বিগত দিনে দেশের বড় বড় প্রকল্পগুলো বিদেশি ঋণ বা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল থাকত। কিন্তু এই ৯৪২ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে কোনো বিদেশি ঋণ না নিয়ে সিএএবি-এর নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করা হয়েছে, যা সরকারের আর্থিক স্বাবলম্বিতা ও নীতিগত সাহসিকতার প্রমাণ।
ফ্রান্স সরকারের সাথে সম্পূর্ণ জি-টু-জি (G-to-G) ভিত্তিতে আইসিএও’র (ICAO) আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করে এই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে। কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেট ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জট খুলে প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়।
বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর নজরদারি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকার দেশের আকাশসীমার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে জাতীয় নিরাপত্তা যেমন জোরদার হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত হচ্ছে।
নিরাপদ আকাশসীমা ও অত্যাধুনিক এটিসি ব্যবস্থার কারণে বিশ্বের নামী-দামী এয়ারলাইন্সগুলো এখন বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। এটি পরোক্ষভাবে দেশের পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় ও নিরাপদ করে তুলছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন এটিসি টাওয়ার ও রাডার ব্যবস্থা কেবল একটি কংক্রিটের কাঠামো বা প্রযুক্তির সংযোজন নয়; এটি বৈশ্বিক মানচিত্রে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক নতুন বাতিঘর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের “বাংলাদেশ প্রথম” নীতির আলোকেই দেশের এভিয়েশন খাত আজ বিশ্বমানের আধুনিকতায় ভূষিত।
আমরা আশা করব, এই সফলতার ধারাবাহিকতা ধরে রেখে দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরগুলোরও আধুনিকায়ন করা হবে, যা স্বাধীন বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান এভিয়েশন ও অর্থনৈতিক হাবে পরিণত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক