জাতীয় বাজেট ২০২৬: অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সাধারণ মানুষের স্বস্তির বাজেট
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের বিস্তারিত বিশ্লেষণ। নবম পে-স্কেল, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থ পাচার রোধে পদক্ষেপ ও বাজার সিন্ডিকেট দমনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।
একটি রাষ্ট্রের টেকসই অগ্রযাত্রা নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক দর্শনের দূরদর্শিতা এবং জনকল্যাণের সদিচ্ছার ওপর। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ কোটি টাকার নতুন জাতীয় বাজেটটি কেবল একটি প্রচলিত বার্ষিক আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, বরং এটি লুণ্ঠিত অর্থনীতিকে সুশৃঙ্খল ধারায় ফিরিয়ে আনার এক সাহসী দলিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্র সংস্কারের দর্শন এবং “বাংলাদেশ প্রথম” নীতির ওপর ভিত্তি করে প্রণীত এই বাজেটের প্রধান লক্ষ্য—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মাঝেও এই বাজেটের লক্ষ্যমাত্রাগুলো যেভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা যেমন ইতিবাচক, তেমনি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।
বিগত এক দশকে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ যেভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে, তা দূর করা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় এই বাজেটে দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য
কার্যকরের লক্ষ্যে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার এই সিদ্ধান্ত বর্তমান বাজার বাস্তবতায় চাকুরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার নতুন জোয়ার সৃষ্টি করবে।
একই সাথে, এবারের বাজেটে ভৌত অবকাঠামো এবং যোগাযোগ খাতকে যেভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার।
সাড়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অনুমোদন এবং যোগাযোগ খাতে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে মূল ধারার সাথে যুক্ত করবে।
বিলাসী ও অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তি (যেমন বৈদ্যুতিক যানবাহনে শুল্ক ছাড়)-তে যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আধুনিক ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার সুদূরপ্রসারী চিন্তারই প্রতিফলন।
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সংসদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অধীনে নবগঠিত ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন’-এর কার্যক্রম বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে।
দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার লুণ্ঠিত সম্পদ আদালতের মাধ্যমে অবরুদ্ধ করা ইতিমধ্যেই সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই লুণ্ঠিত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন মেটানোর যে কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই বাজেটে দৃশ্যমান মেগা প্রজেক্টের চেয়ে ‘ভ্যালু ফর মানি’ বা জনগণের করের টাকার সর্বোচ্চ ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নিচে বাজেটের প্রধান কাঠামোগত দিকগুলো তুলে ধরা হলো-
প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়িয়ে কর ফাঁকি রোধে সমন্বিত ডিজিটাল টাস্কফোর্স গঠন।
বাজার সিন্ডিকেট দমনে কঠোর মনিটরিং এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা।
জাতীয় স্টার্টআপ তহবিল এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি।
যেকোনো ভালো বাজেটের আসল সাফল্য নির্ভর করে তার শতভাগ স্বচ্ছ বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে প্রকল্প শেষ করতে দেরি করা এবং কৃত্রিমভাবে খরচ বাড়িয়ে দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি আমলাতন্ত্রে তৈরি হয়েছিল, তা ভাঙাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আপসহীন নেতৃত্ব এবং কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির কারণে এবার সেই অনিয়মের পথ রুদ্ধ হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কঠোর মনিটরিং বজায় থাকলে এই বিশাল বাজেটের সুফল দেশের প্রতিটি নাগরিকের ঘরে পৌঁছাতে বাধ্য।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি কোনো কাল্পনিক বা উচ্চাভিলাষী সংখ্যার খেলা নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ক্ষত মেরামতের এক বাস্তবসম্মত পথনকশা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী ও সংস্কারমুখী চিন্তা এই বাজেটকে একটি বৈপ্লবিক রূপ দিয়েছে, যা একদিকে লুণ্ঠনকারীদের শাস্তির মুখোমুখি করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার বুকে একটি স্বনির্ভর ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।