সম্পাদকীয় ডেস্ক: একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তিসমূহ সর্বদা তার স্বনির্ধারিত জাতীয় অগ্রাধিকার ও ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু গত ১৪ মে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত জ্বালানি সহযোগিতা-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতের মোড়কে এক গভীর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে।
এই সমঝোতা স্মারকে সাশ্রয়ী মূল্য ও টেকসই সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, এর ভেতরের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দিকগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে দেশের সামগ্রিক স্বার্থের অনুকূলে কোনো স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় না।
বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের বর্তমান অস্থিরতা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি আমাদের একটি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি আমদানিনির্ভরতার চক্রে আটকে ফেলার আশঙ্কা তৈরি করছে।
গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ফোরাম ‘গ্যাস এক্সপোর্টিং কান্ট্রি ফোরাম’ (জিইসিএফ)-এর সাম্প্রতিক বিশেষজ্ঞ মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বাজার এখন আর সম্পদের সংকটে ভুগছে না, বরং ক্রমবর্ধমান মার্জিনাল খরচ ও মূলধনী সীমাবদ্ধতার কারণে এর উৎপাদন ব্যয় নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যেখানে বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর তরলীকরণ খরচ প্রতি এমএমবিটিইউতে ৩ মার্কিন ডলারের নিচে ছিল, সেখানে নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর খরচ ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৪ ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো গড়ে তোলার তোড়জোড় প্রকারান্তরে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার দিকেই বাংলাদেশকে ঠেলে দেবে।
যে বাজার নিজেই অর্থনৈতিকভাবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ, তাকে ‘দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিনিরাপত্তা’র সাশ্রয়ী পথ হিসেবে উপস্থাপন করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
এই সমঝোতা স্মারকের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের মতো বিপুল সম্ভাবনাময় খাতকে আড়ালে রেখে বায়োএনার্জি (জৈব জ্বালানি) এবং জিওথার্মাল (ভূতাপীয়) শক্তিকে কৌশলগত সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) দীর্ঘকাল ধরে সতর্ক করে আসছে যে, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়া অন্য যেকোনো ধরনের বায়োএনার্জি (যেমন খাদ্যশস্য থেকে ইথানল উৎপাদন) সরাসরি বন সুরক্ষা ও খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং খাদ্যমূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে বাংলাদেশের কৃষিজমি যেখানে প্রতি বছর আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে, সেখানে কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বায়োএনার্জির সম্প্রসারণ দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে।
তদুপরি, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও হাইড্রোলজিক্যাল গঠন কোনোভাবেই জিওথার্মাল এনার্জি উৎপাদনের উপযোগী নয়। ফলে, দেশের জন্য অকার্যকর ও ক্ষতিকর প্রযুক্তি আমদানির এই তোড়জোড় কার স্বার্থে, সেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর থেকেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির ওপর যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, এই সমঝোতা স্মারক তার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী আচরণ প্রকাশ করে। একদিকে যখন ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত ‘সিলেক্টইউএসএ ইনভেস্টমেন্ট সামিট’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জ্বালানি জায়ান্ট ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্থানীয় ভিত্তি তৈরির তৎপরতা চলছে, অন্যদিকে তখন জাতীয় সংসদে এই জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট নীতি নিয়ে কোনো গঠনমূলক আলোচনা বা মূল্যায়নের দেখা মিলছে না।
সরকারের এক মন্ত্রণালয় যখন টেকসই জ্বালানির কথা বলছে, অন্য মন্ত্রণালয় তখন টেকসই নীতিবিরোধী ও ক্ষতিকর বিদেশী বাণিজ্যিক স্বার্থের সমঝোতায় সই করছে—নীতিমালার এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈপরীত্য আমাদের জ্বালানি খাতকে চিরকাল বিদেশিদের কাছে জিম্মি করে রাখবে।
অতীতে অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প, চড়া সুদের বিদেশি ঋণ এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশ যে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে, তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার এখনই সময়। আমাদের স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে—আগে নিজস্ব টেকসই জ্বালানিকৌশল ও জাতীয় সক্ষমতার মূল্যায়ন, পরে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা; এটাই হওয়া উচিত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কাম্য বৈশিষ্ট্য।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।