সম্পাদকীয়

‘জুলাই ৩৬ জাদুঘর’—ক্ষমতার দম্ভ বনাম ছাত্র-জনতার ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক : এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও গণসংগ্রামের ধারায় ৫ আগস্ট একটি ঐতিহাসিক বাঁক। ২০২৪ সালের সেই উত্তাল দিনে ছাত্র-জনতার অপ্রতিরোধ্য ‘বর্ষাবিপ্লবে’ পতন ঘটেছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের। সেই স্মৃতির অমলিন স্মারক হিসেবে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’কে রূপান্তরিত করা হয়েছে ‘জুলাই ৩৬ গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে’।

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক জাদুঘরের উদ্বোধন করেছেন। গণভবন—যা একসময় ছিল প্রতাপশালী ও অনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, আজ তা নিপীড়িত জনগণের আত্মত্যাগ ও গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হয়েছে।

এটি কেবল অতীত ইতিহাসের এক সংগ্রহশালা নয়, বরং ভবিষ্যতে যেকোনো শাসকশ্রেণীর জন্য ফ্যাসিবাদের পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এক জীবন্ত সতর্কবার্তা।

‘জুলাই ৩৬ জাদুঘর’-এর গ্যালারিগুলোতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও তথ্যভিত্তিক উপায়ে বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের নানা কালো অধ্যায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

১৭ বছরের ভোটবিহীন শাসন, নজিরবিহীন দুর্নীতি, ব্যাংক খাত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ভয়াবহ তথ্যচিত্র এখানে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে বিরোধীদের দমনে তৈরি করা গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর প্রতীকী উপস্থাপনা ও গুম-নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর আত্মনাদ যেকোনো দর্শনার্থীকে নাড়া দেয়।

একই সাথে, জুলাই আন্দোলনের ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর স্মৃতি প্রতিটি প্রদর্শনীতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘এক দফা’ দাবিতে রূপ নেওয়া ছাত্র-জনতার রাজপথ দখল, বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া বীর শহীদদের স্মারক, স্নিগ্ধ হাত বাড়িয়ে শহীদ মুগ্ধের ‘পানি লাগবে পানি’র সেই আত্মত্যাগের দৃশ্য এবং আপামর জনতার প্রতিরোধের প্রতীকী প্রদর্শনী জাদুঘরটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। শেখ হাসিনার ব্যবহৃত কক্ষ ও প্রাঙ্গণে শহীদদের রক্তাক্ত জামাকাপড়, গুলির চিহ্ন এবং অভ্যুত্থানকারীদের বিজয়োচ্ছ্বাসের অক্ষত স্মারক রাখা হয়েছে—যা ক্ষমতার অহংকার ভাঙার প্রত্যক্ষ দলিল।

এই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠাকরণের নেপথ্যে যে মূল চেতনা কাজ করছে, তা হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যেকোনো অপব্যবহারের পরিণতি সম্পর্কে শাসক সমাজকে সচেতন রাখা। এটি ভবিষ্যৎ সকল সরকারের জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বার্তা বহন করে।

গণভবনের দেওয়াল থেকে শুরু করে এর ধূলিকণা সাক্ষী দেয় যে, বন্দুকের নল বা আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো ফ্যাসিস্ট সরকার অনন্তকাল টিকে থাকতে পারে না।

যেকোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি বর্জন করতে হবে। ভবিষ্যতে কেউ যদি ফ্যাসিবাদের দিকে পা বাড়াতে চায়, তবে এই জাদুঘর তাদের সতর্ক করে দেবে যে জনগণের ক্ষোভের বাঁধ ভাঙলে পতনের পরিণতি কতটা করুণ হতে পারে।

‘বর্ষাবিপ্লব’ বা জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীনতা, ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এই জাদুঘর দেশের তরুণ প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও অন্যায়ের প্রতিবাদী হতে অনুপ্রাণিত করবে।

‘জুলাই ৩৬ জাদুঘর’ কেবল অতীতের ক্রান্তিকাল ও আত্মত্যাগের প্রদর্শনী স্থান নয়; এটি আমাদের জাতীয় চেতনার এক ঐতিহাসিক দর্পণ। বাংলাদেশ যেন আর কোনো দিন ফ্যাসিবাদের মুখোমুখি না হয় এবং গণমানুষের অধিকার যেন শাসকশ্রেণীর পদতলে পিষ্ট না হয়—এই জাদুঘর যুগে যুগে প্রতিটি শাসক ও নাগরিককে সেই পাঠ মনে করিয়ে দেবে। বর্ষাবিপ্লবের রক্তস্নাত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সবাইকে এক গণতান্ত্রিক ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।

Related News

দল-মত ভুলে দেশের স্বার্থে জাতির স্বার্থে জুলাইকে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে : এম. নাজমুল হাসান

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস, শেখ হাসিনার পতন এবং বর্তমান বাংলাদেশ পুনর্গঠনে দল-মত ভুলে এক হয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত বনাম ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য: কলুষতা রোধে চাই জরুরি পদক্ষেপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সহিংস সংঘর্ষ, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা এবং ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য রক্ষায় করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

নতুন এটিসি টাওয়ার ও আধুনিক রাডার: আকাশসীমার নিরাপত্তা ও জাতীয় রাজস্বে এক নবদিগন্ত

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন এটিসি টাওয়ার ও অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম চালুর সুফল, আকাশসীমার নিরাপত্তা এবং ফ্লাইং ওভার চার্জে রেকর্ড রাজস্ব আদায় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা ও মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি : একটি কৌশলগত সমাধান

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির সরকারের প্রস্তাব, এর বাস্তবায়ন কৌশল এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস সংকট নিরসনে করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

সরকার-ব্যবসায়ী যৌথ অংশীদারিত্ব: পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ

বিডার মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য, আগামী ৫ বছরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিতকরণ এবং ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রোহিঙ্গা সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উপস্থিতি: প্রত্যাবাসনের টেকসই রোডম্যাপ প্রণয়নের এটাই উপযুক্ত সময়

মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

মাঠপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন: জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

ডিএনসিসি প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রীর নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সড়ক পরিদর্শনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

নিত্যপণ্যে অদৃশ্য বিষ, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও আমাদের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশের সয়াবিন তেল, চিনি ও টুথপেস্টে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, জনস্বাস্থ্যে এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং তা থেকে আত্মরক্ষার করণীয় নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

Search