সম্পাদকীয়

সরকার-ব্যবসায়ী যৌথ অংশীদারিত্ব: পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ

দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রয়াস যে মূল চাবিকাঠি—সে সত্যই নতুন করে প্রতিফলিত হলো বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) উদ্যোক্তা সম্মেলনে। সম্প্রতি তেজগাঁওয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সাথে আয়োজিত চার ঘণ্টাব্যাপী এক দ্বিপক্ষীয় মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক রূপান্তর সম্ভব।

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সাথে একাধিক বৈঠক এবং পূর্ববর্তী ২৮টি সংকটের মধ্যে ২১টির তাৎক্ষণিক সমাধান প্রশাসনিক সদিচ্ছারই প্রতিফলন। তবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জাতীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ও টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে প্রথাগত আলোচনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু নীতিগত ও কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত ২০৩০ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং সার্বিক অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে নিম্নলিখিত কৌশলগত পদক্ষেপসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

শিল্প খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত স্থায়িত্ব। ঘন ঘন রাজস্ব নীতি, শুল্ক কাঠামো বা ব্যাংক সুদের হার পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়। উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে সুদের হার পুনর্নির্ধারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করে ঋণ প্রবাহ সহজ করা এখন সময়ের দাবি।

বিডা বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস (OSS)-কে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে শতভাগ কার্যকর করতে হবে। নতুন শিল্প স্থাপনের অনুমতি, এনবিআর (NBR) ও কাস্টমস সম্পর্কিত ছাড়পত্র প্রাপ্তিতে যে দীর্ঘসূত্রতা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়, তা নিরসন করা জরুরি। প্রশাসনিক ওয়ান-স্টপ সিস্টেম তৈরি হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ছাড়া শিল্পায়ন অসম্ভব। সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের মতো পরিস্থিতি যাতে শিল্প খাতকে থমকে না দেয়, সেজন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংমিশ্রণ এবং দ্রুত অবকাঠামোগত ব্যাকআপ নিশ্চিত করতে হবে।

কেবল তৈরি পোশাক খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে চামড়া, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি (IT), কৃষি-প্রসেসিং ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে জোর দিতে হবে। ২০৩০ সালের ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিদেশের মাটিতে কূটনৈতিক মিশনগুলোকে ‘অর্থনৈতিক মিশন’ হিসেবে ব্যবহার করে নতুন নতুন বাজারের দ্বার উন্মোচন করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী প্রতি দুই-তিন মাস পরপর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সশরীরে বসে সংলাপের যে অনন্য সংস্কৃতি তৈরি করেছেন, তা সমস্যা সমাধানের পথকে সুগম করবে। সরকার যদি নীতিগত ও কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে আর ব্যবসায়ীরা যদি তাদের মেধা, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ সক্ষমতাকে কাজে লাগান, তবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ এক সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

রোহিঙ্গা সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উপস্থিতি: প্রত্যাবাসনের টেকসই রোডম্যাপ প্রণয়নের এটাই উপযুক্ত সময়

মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

মাঠপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন: জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

ডিএনসিসি প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রীর নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সড়ক পরিদর্শনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

নিত্যপণ্যে অদৃশ্য বিষ, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও আমাদের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশের সয়াবিন তেল, চিনি ও টুথপেস্টে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, জনস্বাস্থ্যে এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং তা থেকে আত্মরক্ষার করণীয় নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

সাময়িক সংকট ও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা, মালয়েশিয়ার সহায়তা এবং আমাদের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

এফএসআরইউ বিকল হওয়ায় দেশে সৃষ্টি হওয়া গ্যাস সংকট, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সংকট উত্তরণে করণীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাষ্ট্রপতি নিয়োগের যোগ্যতা ও বৈশ্বিক গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রজ্ঞা, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে সফলভাবে তুলে ধরতে দক্ষ রাষ্ট্রপতির গুরুত্ব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয় নিবন্ধ।

ভিআইপি সংস্কৃতির ইতি ও সাধারণের স্বস্তি, ১৮ মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহারের ইতিবাচক বার্তা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সরকারের ১৮ জন মন্ত্রীর ভিআইপি প্রটোকল ও পুলিশের এসকর্ট গাড়ি প্রত্যাহারের ফলে ঢাকার ট্রাফিক, পুলিশিং ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সৃষ্ট সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

বাংলাদেশ-ইউরোপীয় ইউনিয়ন কৌশলগত অংশীদারিত্ব হতে পারে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও ইইউ কাজা কালাসের আসিয়ান বৈঠকের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-ইইউ কৌশলগত বাণিজ্য, জাতিসংঘ সংস্কার ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধান নিয়ে সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, নব দিগন্তের সূচনা ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রত্যাশা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ, শুভেচ্ছা জ্ঞাপন এবং সংবিধান অনুযায়ী সুশাসন ও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে শুভকামনা ও প্রত্যাশার সম্পাদকীয়।

Search