সম্পাদকীয়

শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত বনাম ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য: কলুষতা রোধে চাই জরুরি পদক্ষেপ

বাংলাদেশের অর্জনের ইতিহাসের সাথে ছাত্ররাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা পরবর্তীতে প্রতিটি গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এ দেশের ছাত্রসমাজ ও ছাত্র সংগঠনগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ছাত্ররাজনীতি মূলত অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের অন্যতম চালিকাশক্তি।

অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যবর্তী যে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা ছাত্ররাজনীতির এই গৌরবান্বিত ঐতিহ্যকে মারাত্মকভাবে কলুষিত ও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

গত কয়েক দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্তত পাঁচটি প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রের মহড়া, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর আহত হওয়ার ঘটনা দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক ও অভিভাবককে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

একটি আদর্শিক কিংবা অধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চার পরিবর্তে লাঠিসোঁটা ও সহিংসতার যে প্রদর্শন দেখা যাচ্ছে, তা অন্যান্য ক্যাম্পাসেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের কঠোর বার্তা—‘শিক্ষাঙ্গনে কোনো সন্ত্রাস বরদাশত করা হবে না এবং উসকানিদাতাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে’—একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কেবল নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সুযোগ-সুবিধা, আবাসন সংকট, গবেষণা বাজেট বৃদ্ধি এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। দলীয় পেশিশক্তি ও আধিপত্য বিস্তারের অপরাজনীতি বন্ধ করে সুস্থ চিন্তার চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে।

ভিন্নমত ও আদর্শিক ভিন্নতা রাজনীতির স্বাভাবিক রূপ। কিন্তু সেই মতভেদ যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তা সন্ত্রাসে পরিণত হয়। সংঘাতময় সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে দেশের ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ সকল ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বের উচিত নিজেদের মধ্যে সংলাপ ও সহনশীলতার সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো।

শিক্ষাঙ্গনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও কঠোর হতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে যেন অপরাধী পার পেয়ে না যায়। শিক্ষামন্ত্রীর কঠোর অবস্থানকে বাস্তবে রূপ দিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।

সম্পাদকের শেষ কথা: ছাত্ররাজনীতি কোনো সহিংস মহড়ার মঞ্চ হতে পারে না; এটি হতে হবে ছাত্রদের অধিকার ও সুরক্ষার সুরক্ষিত দুর্গ। অগণিত শহীদের রক্তে অর্জিত এই দেশে ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় ঐতিহ্য রক্ষা করা এবং ক্যাম্পাসগুলোকে সন্ত্রাসমুক্ত রেখে পড়ালেখার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সংঘাতের পথ পরিহার করে সকল ছাত্রসংগঠন সুস্থ ও ইতিবাচক রাজনীতিতে ফিরে আসবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।

Related News

নতুন এটিসি টাওয়ার ও আধুনিক রাডার: আকাশসীমার নিরাপত্তা ও জাতীয় রাজস্বে এক নবদিগন্ত

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন এটিসি টাওয়ার ও অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম চালুর সুফল, আকাশসীমার নিরাপত্তা এবং ফ্লাইং ওভার চার্জে রেকর্ড রাজস্ব আদায় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা ও মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি : একটি কৌশলগত সমাধান

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির সরকারের প্রস্তাব, এর বাস্তবায়ন কৌশল এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস সংকট নিরসনে করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

সরকার-ব্যবসায়ী যৌথ অংশীদারিত্ব: পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ

বিডার মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য, আগামী ৫ বছরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিতকরণ এবং ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রোহিঙ্গা সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উপস্থিতি: প্রত্যাবাসনের টেকসই রোডম্যাপ প্রণয়নের এটাই উপযুক্ত সময়

মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

মাঠপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন: জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

ডিএনসিসি প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রীর নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সড়ক পরিদর্শনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

নিত্যপণ্যে অদৃশ্য বিষ, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও আমাদের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশের সয়াবিন তেল, চিনি ও টুথপেস্টে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, জনস্বাস্থ্যে এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং তা থেকে আত্মরক্ষার করণীয় নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

সাময়িক সংকট ও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা, মালয়েশিয়ার সহায়তা এবং আমাদের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

এফএসআরইউ বিকল হওয়ায় দেশে সৃষ্টি হওয়া গ্যাস সংকট, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সংকট উত্তরণে করণীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাষ্ট্রপতি নিয়োগের যোগ্যতা ও বৈশ্বিক গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রজ্ঞা, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে সফলভাবে তুলে ধরতে দক্ষ রাষ্ট্রপতির গুরুত্ব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয় নিবন্ধ।

Search