সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শীর্ষ বৈঠক ও শ্রমবাজার উন্মুক্তের আহ্বান

সম্পাদকীয়: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি যে অত্যন্ত দূরদর্শী ও সময়োপযোগী ছিল, তার প্রতিফলন ঘটেছে কুয়ালালামপুরের পুত্রাজায়ায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকে।

গত সোমবার (২২ জুন, ২০২৬) মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একান্ত ও প্রতিনিধিদল পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি কেবল প্রোটোকল রক্ষার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং তা ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনীতির জন্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত অর্জনের মঞ্চ।

বিশেষ করে, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের স্বার্থ রক্ষা এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে বাংলাদেশের জন্য দ্রুত উন্মুক্ত করার যে জোরালো তাগিদ প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা দেশের অভিবাসন খাতের জন্য এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।

এই সফরের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো শ্রমবাজারের পুনর্গঠনে দুই দেশের একাত্মতা। বিগত দিনে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কুখ্যাত ‘সিন্ডিকেট’ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ শ্রমিকরা যেভাবে নিঃস্ব হয়েছেন, তা রুখতে এবার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে নতুন সরকার।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা বিলুপ্ত হয় এবং শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় হ্রাস পায়। এর পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং ডিটেনশন সেন্টারে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের মানবিক প্রত্যাবাসনের বিষয়টি উত্থাপন করে সরকার প্রমাণ করেছে যে, প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় তারা আপসহীন।

এই অভিবাসন প্রক্রিয়াকে একটি টেকসই আইনি কাঠামো দিতে দুই দেশের যৌথ সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি।

ঐতিহাসিক ও পারিবারিক ধারাবাহিকতার দিক থেকেও এই সফরটি আবেগ ও দূরদর্শিতার এক অনন্য মিশ্রণ।

১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মালয়েশিয়া সফর এবং পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কুয়ালালামপুর সফরের মাধ্যমে দুই দেশের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কের যে শক্ত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই ধারাবাহিকতাকে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও বহুমুখী অংশীদারত্বে রূপ দিতে চাচ্ছেন।

বৈঠকে কেবল জনশক্তি রপ্তানি নয়, বরং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, ডিজিটাল অর্থনীতি, হালাল শিল্প ও জ্বালানি খাতের মতো উচ্চ মূল্য সংযোজন খাতে মালয়েশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের নিশ্চয়তা দিয়ে মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের যে আহ্বান প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে।

একই সঙ্গে, আঞ্চলিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এই সফর মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট ‘আসিয়ান’ -এর সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়া এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব -এ যোগদানের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সমর্থন আদায় করা ঢাকার জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়।

তাছাড়া, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে মালয়েশিয়ার আনুষ্ঠানিক সমর্থন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কুয়ালালামপুরের অবিচল অবস্থান দুই দেশের গভীর বন্ধুত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।

বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতি, বিনিয়োগ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে সক্ষমতা বৃদ্ধির যে তিনটি দ্বিপক্ষীয় দলিল ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা এই বন্ধুত্বকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।

আমরা আশা করি, এই দ্বিপক্ষীয় সমঝোতাগুলোর দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পারস্পরিক সমৃদ্ধির এক নতুন শিখরে পৌঁছাবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

শিশু অপ্রতিম হত্যা ও জননিরাপত্তার সংকট; প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নাকি সামাজিক অবক্ষয়?

অপ্রতিম হত্যা, নিখোঁজ শিশু উদ্ধার ব্যবস্থার দুর্বলতা, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য ও জাতীয় অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাবের আশঙ্কা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধিতে দেশের অর্থনীতি, পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপ্রতিম হত্যার মূল কারণ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

কুমিল্লায় শিশু অপ্রতিম হত্যার বিচার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূরীকরণ ও শিশু হত্যা রোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের তাগিদে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ, অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধে সরকারকে কঠোর হতে হবে : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিশেষ সম্পাদকীয়।

বাংলাদেশ-ভারত কূটনীতি, রাষ্ট্রপ্রধানদের সৌজন্য বিনিময় ও প্রতিবেশী সম্পর্কের বার্তা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুভেচ্ছা ও মোদির ধন্যবাদ জ্ঞাপন নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

র‍্যাব পরিবর্তন হয়ে এসআরবির নতুন যাত্রা: সাইনবোর্ড পরিবর্তন নাকি প্রকৃত সংস্কার?

‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (SRB) নামে র‍্যাবের নতুন যাত্রার আইনি ভিত্তি, বিতর্ক ও মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে চাই আঞ্চলিক সুশাসন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে লক্ষ্মীপুরে আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সভায় সামাজিক অবক্ষয়, অবৈধ ইটভাটা ও মাদক প্রতিরোধের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

বিমা দাবি পরিশোধ ও আইডিআরএ সংস্কার এখন সময়ের দাবি : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিমা খাতের অনিয়ম ও ৫৭% বকেয়া দাবি পরিশোধে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নির্দেশনা ও আইন সংশোধনের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search