খেলাধুলা ডেস্ক: ‘যদি কোনো কিছু তুমি মন থেকে চাও, তবে পুরো মহাবিশ্ব তোমাকে তা পাইয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়’—পাওলো কোয়েলহোর বিখ্যাত এই উক্তিটিকে ইরান ফুটবল দল হয়তো এখন তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। নকআউটের চৌকাঠে পৌঁছানোর জন্য তারা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্য আর নিয়মের জটিল বেড়াজালে মহাবিশ্বের সব সমীকরণ যেন তাদের বিপক্ষেই গেল।
ইতিহাস গড়ার খুব কাছাকাছি গিয়েও তিন-তিনবার স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হলো পশ্চিম এশিয়ার এই দেশটিকে। শেষ ম্যাচে মিশরকে হারাতে পারলেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিত তারা। ম্যাচের যোগ করা সময়ে সোজা খালিলজাদেহ মিশরের জালে বল জড়িয়ে উদযাপনে মেতে উঠেছিলেন। সিয়াটল থেকে তেহরান—সবখানেই তখন ইতিহাস গড়ার আনন্দ। কিন্তু বাঁধ সাধল ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)। অফসাইডের এক জটিল ও বিরল নিয়মে বাতিল হয়ে যায় সেই গোল। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী বল রিসিভ করার সময় সামনে অন্তত দুজন ডিফেন্ডার থাকতে হয় (সাধারণত গোলরক্ষকসহ), সেখানে ইরানের খেলোয়াড় যখন বল পান, তখন সামনে কেবল একজন ডিফেন্ডার ও পেছনে গোলরক্ষক থাকায় গোলটি অফসাইড ঘোষিত হয়।
সেই ড্রয়ের পর ইরানের ভাগ্য ঝুলে যায় অন্যান্য ম্যাচের সমীকরণের ওপর। নকআউটে যেতে হলে তাদের তাকিয়ে থাকতে হতো বাকি দলগুলোর ফলের দিকে। কিন্তু আজ সকালে একে একে সব সমীকরণ ইরানের বিপক্ষে যায়। প্রথমে ক্রোয়েশিয়ার জয়, এরপর উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ডিআর কঙ্গোর ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জিতে নেওয়া ইরানের পথ কঠিন করে তোলে। সবশেষে আশা ছিল অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া ম্যাচের ওপর। এই ম্যাচের যেকোনো এক দল হারলেই ৩ পয়েন্ট নিয়ে পরের রাউন্ডে যেত ইরান। আলজেরিয়া যখন যোগ করা সময়ের ৯৪ মিনিটে রিয়াদ মাহরেজের গোলে এগিয়ে যায়, তখন ইরানের উৎসব প্রায় নিশ্চিত ছিল। কারণ অতিরিক্ত সময় ছিল মাত্র ৫ মিনিট। কিন্তু নাটকের তখনও বাকি ছিল; ৯৬ মিনিটে সাশা কালাইজিচের গোলে অস্ট্রিয়া সমতায় ফিরলে দুই দলই শেষ ৩২-এ কোয়ালিফাই করে, আর কপাল পোড়ে ইরানের।
তবে এই বিদায়কে কোনোভাবেই ব্যর্থতা বলা যাবে না। টুর্নামেন্টে নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিশরের মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে তিন ম্যাচ খেলে একটিতেও হারেনি ইরান। বিশেষ করে যে চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে, তাতে এই অপরাজিত থাকা যেকোনো জয়ের চেয়েও বড়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছিল ফুটবল দলের ওপরও। একঝাঁক কর্মকর্তাকে ভিসাই দেওয়া হয়নি। ফুটবলাররা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেলেও দেশটিতে অবস্থান করার অনুমতি পাননি। ফলে প্রতিটি ম্যাচের আগের দিন স্টেডিয়ামে অনুশীলনের যে নিয়ম থাকে, তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে ইরান। মেক্সিকোতে অবস্থান করে ম্যাচের দিন বিমানে উড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলতে হয়েছে তাদের, আবার খেলা শেষে ওই দিনই ফিরতে হয়েছে মেক্সিকোতে। ম্যাচ পরবর্তী খেলোয়াড়দের শারীরিক রিকভারির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়টা তাদের কেটেছে বিমানের ধকল সইতে সইতে।
রাজনৈতিক বৈরিতা, মানসিক চাপ আর বিমানযাত্রার চরম শারীরিক ক্লান্তি—সব প্রতিকূলতা জয় করে মাঠের লড়াইয়ে বীরত্ব দেখিয়েছে ইরান। প্রথমবারের মতো নকআউটে যেতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও, শত্রুভাবাপন্ন যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে অপরাজিত থেকে তারা দেশে ফিরছে অন্তত মাথা উঁচু করে।