সম্পাদকীয়

নিত্যপণ্যে অদৃশ্য বিষ, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও আমাদের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে চরম এক সতর্কবার্তা হয়ে দেখা দিয়েছে। টুথপেস্ট ও সয়াবিন তেলের পর এবার চিনিতে বিষাক্ত প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়ার ভয়াবহ তথ্য উদঘাটিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সাময়িকী Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা চিনির নমুনার ৯৫ শতাংশেরই মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিদ্যমান, যেখানে প্রতি কেজিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। এর আগে সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৩,৯২২টি কণা এবং শিশুদের টুথপেস্টেও এই বিষাক্ত উপাদানের সন্ধান মিলেছে।

রান্নাঘর থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা—প্রতিটি ধাপে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের মাধ্যমে প্রতিদিন অজান্তেই আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে এই অদৃশ্য বিষ কণা, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় জনস্বাস্থ্যকে এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলছে।

চিনি উৎপাদন, পরিশোধন, প্লাস্টিক মোড়কীকরণ, পরিবহন ও খোলা বাজারে সংরক্ষণের বিভিন্ন ধাপে ABS, PVC, PET, PTFE ও নাইলনের মতো বিপজ্জনক পলিমার কণা খাদ্যে মিশে যাচ্ছে। আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্যাভ্যাসের মধ্য দিয়েই এই বিষাক্ত কণাগুলো প্রবিষ্ট হওয়ায় কোষীয় পর্যায়ে নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

এই উদ্ভূত জাতীয় সংকটে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিকগুলো চিহ্নিত করা এবং তা থেকে আত্মরক্ষায় জরুরি রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলো (বিশেষ করে ১২ মাইক্রোমিটারের কম আকারের কণা) অন্ত্রের প্রাচীর ভেদ করে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। এটি পাকস্থলী, যকৃৎ ও কিডনিতে জমে প্রদাহ (Inflammatory Response) ও টিস্যু ক্ষতির কারণ হয়।

প্লাস্টিকের উৎপাদনে ব্যবহৃত রাসায়নিক যেমন—বিসফেনল-এ (BPA) ও থ্যালেটস (Phthalates) অ্যান্ডোক্রাইন সিস্টেম বা হরমোন নিঃসরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। এর ফলে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস, থাইরয়েডের সমস্যা ও শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধার সৃষ্টি হয়।

গবেষণায় শনাক্তকৃত হ্যাজার্ড-টু-কনসেন্ট্রেশন অনুপাত ইঙ্গিত দেয় যে, শরীরের ভেতরে বছরের পর বছর জমতে থাকা বিষাক্ত পলিমার ও কেমিক্যাল কোষের মিউটেশন ঘটিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়ায়।

রক্তে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শ্বেত রক্তকণিকার কাজ ব্যাহত করে, ফলে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

শিল্প কারখানায় প্লাস্টিকের পাইপ, ফিল্টার ও সিন্থেটিক প্যাকেজিংয়ের পরিবর্তে স্টেইনলেস স্টিল, কাঁচ ও খাদ্য-বান্ধব (Food-grade) পরিবাহী সরঞ্জাম ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা জারি করতে হবে।

গৃহস্থালিতে গরম তেল বা খাদ্যদ্রব্য প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। বাজারজাতকরণে খোলা প্লাস্টিকের বদলে কাঁচ, কাগজ বা নিরাপদ ধাতব মোড়ক ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে।

খাদ্য মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে খাদ্যদ্রব্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিমাপের জন্য আধুনিক FTIR স্পেকট্রোস্কপির মতো ল্যাব টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে।

যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা বন্ধ করা, উৎস পর্যায়ে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার (Recycling) নিশ্চিত করা এবং দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহার কমিয়ে আনার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ এখন কোনো তাত্ত্বিক সংশয় নয়; এটি আমাদের ঘরের চৌকাঠে কড়া নাড়া এক বাস্তব ও দৃশ্যমান স্বাস্থ্য সংকট। শুধু আইন কিংবা ব্যক্তিগত সতর্কতায় এই সমস্যার একক সমাধান সম্ভব নয়; সরকারি তদারকি, শিল্প মালিকদের দায়িত্বশীলতা এবং সামাজিক সচেতনতার এক সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল এই অদৃশ্য বিষ থেকে আমাদের খাদ্যতালিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

সংলাপ ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা – রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণধর্মী কলাম।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ফেনী সফর; উন্নয়ন, আবেগ ও সুশাসনের চিত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর, কৃষক কার্ড বিতরণ, মহুরী সেচ প্রকল্প ও ১০০ শয্যার হাসপাতাল ঘোষণা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক শৃঙ্খলার পরীক্ষা ও সরকারের দায়বদ্ধতা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, সরকারের বিব্রতবোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বেঁধে দেওয়া ঠিক হবে না : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার বিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থায়ী রূপরেখা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

খেলাপি ঋণের পাহাড় ও ব্যাংকিং খাতের সংকট: কাগজের শিথিলতা নয়, চাই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি

বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও সংকটাপন্ন ঋণের সর্বশেষ চিত্র, কাঠামোগত ত্রুটি এবং ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে চার দফা জরুরি সুপারিশ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা অনুপ্রবেশকারী ও অপশক্তির ষড়যন্ত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও ভাঙচুর, হাইব্রিড নেতাদের অপতৎপরতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

চুয়েট উপাচার্য নিয়োগ বিতর্ক ও সংকট : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

চুয়েট উপাচার্য অপসারণ, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নতুন ভিসির অনলাইনে যোগদান ও শিক্ষাঙ্গনের অচলাবস্থা নিরসনে করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: বৈশ্বিক মঞ্চে সুশাসন, শান্তি ও টেকসই প্রগতির দৃপ্ত বার্তা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, জলবায়ু তহবিল, রোহিঙ্গা সংকট ও বিশ্বশান্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search