সম্পাদকীয়

শিক্ষা খাতের সংস্কার, নারী শিক্ষার অগ্রগতি ও আগামীর মানবসম্পদ : আতাউর রহমান মিন্টু

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের  ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের শ্রমবাজার তীব্র পরিবর্তনের সম্মুখীন। চিরাচরিত শ্রমঘন পেশা থেকে দক্ষতা ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে স্থানান্তরের এই সন্ধিক্ষণে একটি কার্যকর, আধুনিক ও লিঙ্গ-সমতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের শীর্ষে অবস্থান করছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো , বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো  এবং ইউনেস্কো -এর সাম্প্রতিক উপাত্ত ও সূচকসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, শিক্ষায় প্রবেশাধিকার ও জেন্ডার সমতা অর্জনে লক্ষণীয় সাফল্য থাকলেও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, বাজেটের বাস্তবায়ন এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা বিদ্যমান।

বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে প্রথাগত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিখন পদ্ধতি থেকে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতিতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। তবে নীতিগত সংস্কারের সাথে শ্রেণীকক্ষের বাস্তব অভিজ্ঞতার দূরত্ব রয়ে গেছে।

জাতীয় পাঠ্যক্রম রূপরেখা ২০২২-এর মাধ্যমে অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষা এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল মুখস্থবিদ্যা-ভিত্তিক প্রথাগত ধারা থেকে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও বাস্তবমুখী দক্ষতায় উন্নীত করা। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড—বিশেষ করে ‘অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’  নির্ধারিত ‘প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট’-এর সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষা স্তরে প্রাক-ব্যবহারিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত চর্চার সুযোগ অত্যন্ত অপ্রতুল

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতকে সাধারণ ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে পৃথক করে রাখার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি শিক্ষার সাথে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের আধুনিক চাহিদার সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হচ্ছে না। কারিগরি শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ সীমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা প্রদর্শনে আমাদের মানবসম্পদ পিছিয়ে পড়ছে

শিক্ষার গুণগত মান ও শ্রেণীকক্ষের কার্যকারিতা মূলত শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করে।

প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বর্তমানে ১:৩০ এবং এ স্তরে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ৭৭.৮৮%। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০% নারী শিক্ষক নিয়োগের ধারাবাহিক নীতির ফলে এ খাতে মোট নারী শিক্ষকের হার ৬৫.৮৭%-এ পৌঁছেছে। মাধ্যমিক স্তরে ৯০.৬৩ লাখ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ২,৯৩,২৮৯ জন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত প্রায় ১:৩১। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক—বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানে—দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪৪, যা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (১:২১) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পাঠ্যক্রম রূপরেখা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা পরিচালনায় শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও মানসিক প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে, যা মূল্যায়নে ব্যক্তিনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং শিক্ষার সঠিক গুণগত মান বজায় রাখাকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে

ডিজিটাল অবকাঠামো ও গ্রাম-শহর বৈষম্য

ডিজিটাল বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্লেন্ডেড লার্নিং মাস্টার প্ল্যান গ্রহণের মাধ্যমে আইসিটি শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ নেওয়া হলেও গ্রামীণ ও শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পার্থক্য কমেনি। মেট্রোপলিটন ও শহরের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণীকক্ষ, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং কম্পিউটার ল্যাবের সুবিধা থাকলেও গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসমূহে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, প্রয়োজনীয় কম্পিউটার হার্ডওয়্যার এবং দক্ষ আইসিটি শিক্ষকের অভাব রয়েছে। এর ফলে অনলাইন শিক্ষা ও প্রযুক্তিভিত্তিক জ্ঞানার্জনে গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য দেখা দিচ্ছে

শিক্ষা স্তর মোট শিক্ষার্থী ছাত্রী সংখ্যা (%) মোট শিক্ষক নারী শিক্ষক (%) ঝরে পড়ার হার (%) সমাপ্তির হার (%)
প্রাথমিক ১,৬৬,৮৬,৬২৫ ৫০.৭৫% ৩,৮৩,৬২৪ ৬৫.৮৭% ৯৪.৩০%
মাধ্যমিক ৯০,৬৩,০০০ ৫৪.৭৩% ২,৯৩,২৮৯ ৩১.৫৪% ৩৫.৯৮% ৬৪.০২%
উচ্চ মাধ্যমিক ৪৯,২৬,০০০ ৫১.৫২% ১,৩২,৭৮ণ ২৮.০৫% ২২.৭২% ৭৭.২৮%
মাদ্রাসা (উচ্চ) ২৭,৬২,২৭৭ ৫২.২৬% ১,১৯,০০৮ ১৯.২২%
উচ্চশিক্ষা ১০,৩৪,৩২০ ৩৭.৫৮% ৩০,৮৯৯ ২৯.৭৯%

নারী শিক্ষায় অর্জিত সাফল্য ও সাম্প্রতিক উদ্যোগ

বিশ্বব্যাপী নারী শিক্ষায় অগ্রগতি ও লিঙ্গ সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি সফল উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় ও মাধ্যমিক স্তরে নারীদের এই অগ্রগতি উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে পৌঁছানোর আগে থমকে দাঁড়াচ্ছে।

১৯৯৪ সালে চালুকৃত নারী মাধ্যমিক স্কুল উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং পরবর্তী সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ উদ্যোগগুলো গ্রামীণ অঞ্চলে মেয়েদের বিদ্যালয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। গবেষণায় দেখা যায়, উপবৃত্তি ব্যবস্থার কারণে মাধ্যমিক স্তরে নারীদের শিক্ষার সময়কাল ১৪% থেকে ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শিক্ষা সমাপন নিশ্চিতকরণে ২০ থেকে ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে। BANBEIS-এর সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থীর ৫৪.৭৩% এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৫১.৫২% নারী

মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি ছেলেদের চেয়ে বেশি হলেও, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, পরিবারের আর্থিক দৈন্য, নিরাপত্তা সংকট এবং সামাজিক বাল্যবিবাহের চাপের কারণে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের সার্বিক ঝরে পড়ার হার এখনও ৩৫.৯৮%-এ রয়ে গেছে। ফলে প্রাথমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিকের উচ্চ সাফল্য উচ্চ-মাধ্যমিকের পরে অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হচ্ছে না

ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাথমিক (GPI ১.০১৮) ও মাধ্যমিক (GPI ১.২৪৪) শিক্ষা স্তরে বাংলাদেশ জেন্ডার প্যারিটি ইনডেক্সে উল্লেখযোগ্য ভারসাম্য অর্জন করেছে, যা আন্তর্জাতিক গড় মানকেও ছাড়িয়ে গেছে

শ্রেণীকক্ষে ছাত্রী সংখ্যার অনুপাতিক হার প্রশংসনীয় হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা ও শিক্ষকতায় নারীদের উপস্থিতি অসঙ্গতিপূর্ণ। প্রাথমিকে নারী শিক্ষকের হার ৬৫.৫% হলেও, মাধ্যমিকে তা কমে দাঁড়ায় ৩১.৫৪%-এ এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় মাত্র ১৯.২২%-এ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি সবচেয়ে কম; মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নারী প্রধান শিক্ষকের হার মাত্র ৮.৯৯% (১৭,০৭৭ জনের মধ্যে ১,৫৩৫ জন) এবং কলেজ অধ্যক্ষদের মধ্যে মাত্র ৯.৩৯% নারী (৩,৩৬৪ জনের মধ্যে ৩১৬ জন)

উচ্চশিক্ষায় পৌঁছানোর সাথে সাথে নারী শিক্ষার প্রবৃদ্ধি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে মেয়েদের গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও তলানিতে নেমে আসে এবং জেন্ডার প্যারিটি ইনডেক্স কমে দাঁড়ায় ০.৭৭১-এ। বর্তমানে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৩৭.৫৮% নারী (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১.০৩% এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯.৭২%)

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত খাতে নারীদের উপস্থিতি বিশ্ব গড়ের (৩৫%) চেয়ে কম। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিদ্যায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ৬০%-এর বেশি হলেও, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে তা ২৬%-এর নিচে নেমে যায়। উচ্চ মাধ্যমিকের পর লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবারের আর্থিক অগ্রাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশের অভাবে মেয়েরা প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিষয়ক শিক্ষা থেকে দূরে থাকছে

ক্ষেত্র অর্জিত মান / পরিসংখ্যান তথ্যের উৎস
প্রাথমিক স্তর জেন্ডার প্যারিটি ইনডেক্স (GPI) ১.০১৮

UNESCO / CEIC

মাধ্যমিক স্তর জেন্ডার প্যারিটি ইনডেক্স (GPI) ১.২৪৪

UNESCO / CEIC

উচ্চশিক্ষা স্তর জেন্ডার প্যারিটি ইনডেক্স (GPI) ০.৭৭১

UNESCO / CEIC

বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট নারী শিক্ষার্থী ৩৭.৫৮% (পাবলিক: ৪১.০৩%, প্রাইভেট: ২৯.৭২%)

BANBEIS / GSTU

STEM শিক্ষায় নারী (প্রকৌশল ও প্রযুক্তি) < ২৬%

ResearchGate / BANBEIS

STEM শিক্ষায় নারী (স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা) > ৬০%

ResearchGate

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নারী প্রধান শিক্ষক ৮.৯৯%

BANBEIS / Bonik Barta

কলেজে নারী অধ্যক্ষ ৯.৩৯%

BANBEIS / Bonik Barta

শিক্ষার কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে রাজস্ব নীতি, বাজেটের আকার এবং জাতীয় চাহিদার সামঞ্জস্য রক্ষা করা জরুরি। বর্তমান শিক্ষানীতি ও জাতীয় বাজেটে যে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হচ্ছে তা কাঠামোগত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম কি না, তা অনুধাবন করা প্রয়োজন।

বাজেট বরাদ্দ ও ইউনেস্কো মানদণ্ড

শিক্ষা খাতের উন্নয়নে প্রধান বাধা হলো বাজেটের দীর্ঘস্থায়ী অপ্রতুলতা। ইউনেস্কোর ‘এডুকেশন ২০৩০ ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাকশন‘ নির্দেশিকা অনুযায়ী একটি রাষ্ট্রের সার্বিক বাজেটের অন্তত ১৫-২০% অথবা দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের  ৪-৬% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা প্রয়োজন

অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর জাতীয় প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৯৫,৬৪৪ কোটি টাকা, যা মোট জাতীয় বাজেটের ১২.১১% এবং জিডিপির মাত্র ১.৫৩%। পূর্ববর্তী বছরগুলোতেও এ বরাদ্দ জিডিপির ২.০৩% বা ১.৫২%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, ভুটান জিডিপির ৮%-এর বেশি এবং মালদ্বীপ ৪.৫৮% বরাদ্দ প্রদান করছে

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে বাজেটের সীমাবদ্ধতা পারিবারিক ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্টের উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে মোট খরচের ৭১% অর্থই পরিবারকে তাদের ব্যক্তিগত পকেট থেকে দিতে হয়। এই উচ্চব্যয়ের বোঝা নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রাপ্তির প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে

কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক শিক্ষা ও দক্ষতা-অসঙ্গতি

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সামঞ্জস্যপূর্ণ মানবসম্পদ তৈরিতে সক্ষম হচ্ছে না, যার প্রমান মিলে দেশের শিক্ষিত বেকারত্বের উচ্চ পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৬.২ লাখ বেকার ব্যক্তি রয়েছেন

উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সর্বাধিক। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনকারীদের বেকারত্বের হার ১৩.৫৪%, যেখানে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করাদের মধ্যে বেকারত্ব মাত্র ১.২৫%। দেশে বর্তমানে প্রায় ৮.৮৫ লাখ স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার রয়েছেন এবং স্নাতক ডিগ্রিধারী নারীদের মধ্যে বেকারত্বের সুযোগ আরও সঙ্কুচিত, যা ২০%-এরও বেশি

শ্রমশক্তিতে নারীদের মোট অংশগ্রহণ ২০২৩ সালের ৩৬.৩% (২৫.৩ মিলিয়ন) থেকে কমে ২০২৪ সালে ২৩.৭ মিলিয়নে নেমে এসেছে। বিশেষ করে নগরাঞ্চলে নারীদের শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ২৫.১% থেকে কমে ২২.৫%-এ দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও, কর্মে নিয়োজিত অর্ধেকের বেশি নারীর কাজ অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত (৯৫.৯৬%), যা চাকরি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার অভাব নির্দেশ করে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ যে ডিগ্রি প্রদান করছে, তার সাথে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক খাতের প্রকৃত দক্ষতার চাহিদা মিলছে না

শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কেন্দ্রিক আধুনিক চ্যালেঞ্জ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বব্যাপী শিল্প অটোমেশন এবং ডেটা-চালিত প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে দেশের প্রচলিত কর্মসংস্থান ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতে প্রযুক্তিগত অটোমেশনের কারণে সুইং ও ট্রিমার্স বিভাগে নিয়োজিত নারী শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন। পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের অনুপাত ৮০%-এর উপর থেকে বর্তমানে ৫৫%-৬৫%-এ নেমে এসেছে

এমতাবস্থায় “স্মার্ট বাংলাদেশ” রূপকল্প কিংবা ব্লেন্ডেড লার্নিং মাস্টার প্ল্যান সংক্রান্ত সরকারি উদ্যোগগুলো নীতিগতভাবে ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এআই, কোডিং ও আধুনিক কারিগরি অবকাঠামো যোগ করার ঘোষণা থাকলেও শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় বাজেট ও ল্যাব সুবিধার অভাবে শিক্ষার্থীরা বাস্তব দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে

শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের জন্য আগামীর রোডম্যাপ

শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করে বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ গ্রহণ করা প্রয়োজনদেশব্যাপী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে সাধারণ শিক্ষাধারার বিকল্প নয়, বরং প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

প্রতিটি উপজেলায় ১০০টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্পের দ্রুত কাজ শেষ করা নিশ্চিত করতে হবে এবং এতে আধুনিক শিল্প উপযোগী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে হবে। সিএনসি মেশিনিং, ডিজিটাল নেটওয়ার্কিং, রোবোটিক্স, মেকাট্রনিক্স এবং এআই চালিত ডেটা প্রসেসিং প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মাধ্যমিক স্তরের ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত কারিগরি শিখন বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে সব শিক্ষার্থী প্রাথমিক কারিগরি জ্ঞান অর্জন করতে পারে। একই সাথে কারিগরি খাতে নারীদের আকর্ষণ করতে ভর্তি কোটা ৩০%-এ উন্নীতকরণ এবং বিশেষ আর্থিক সুবিধা প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি

নারীদের উচ্চশিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে রূপান্তরের কৌশল

নারীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষাজীবন শেষে তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানের ঘাটতি মেটাতে প্রাথমিক স্তরের মতো অন্তত ৫০% নিয়োগ কোটা সাময়িকভাবে প্রয়োগ করা যৌক্তিক

কর্মজীবী নারী ও নারী শিক্ষার্থীদের কাজের পরিবেশ তৈরিতে সাশ্রয়ী ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন, নিরাপদ বাস সেবা এবং কর্মক্ষেত্রে হয়রানি নিরোধক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। শিক্ষিত তরুণী ও নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সিএমএসএমই খাতের আওতায় কম সুদে মূলধন বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং তাদের তৈরি পণ্যের ই-কমার্স বাজার সংযোগ ঘটাতে হবে

গবেষণা ও উদ্ভাবনে জোর: ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সমন্বয়

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরি এবং স্নাতক বেকারত্ব হ্রাস করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা আবশ্যক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রস্তাবিত গবেষণা বাজেট (২২৬ কোটি টাকা) বাড়িয়ে মোট শিক্ষা বরাদ্ধের ন্যূনতম ৫% নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পাঠ্যক্রম শিল্পমালিক ও খাতের বিশেষজ্ঞদের সাথে সমন্বয় করে প্রতি তিন বছর পর পর হালনাগাদ করার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে

বেসরকারী খাত যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্থাপন ও যৌথ গবেষণায় অর্থায়ন করে, তবে সেটির ওপর বিশেষ কর ছাড় বা রাজস্ব প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। উচ্চশিক্ষায় ‌এসটিইএম বিষয়ক গবেষণায় তরুণী ও নারী গবেষকদের উৎসাহিত করতে জাতীয় বিশেষ ফান্ড গঠন করা উচিত

শিক্ষা খাতের বর্তমান বাস্তবতা, বাজেট বরাদ্দ এবং নারী শিক্ষার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে, বাংলাদেশ শিক্ষায় প্রবেশাধিকার ও জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ভিত্তি গঠনে সাফল্য প্রদর্শন করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং রূপকল্প ২০৪১ অর্জন করতে হলে কেবল সংখ্যাগত উপস্থিতি নয়, বরং শিক্ষার মানের ওপর গুরুত্ব বৃদ্ধি করা জরুরি

শিক্ষা খাতের টেকসই রূপান্তরের জন্য আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে বাজেটের পরিমাণ বাড়িয়ে মোট বাজেটের অন্তত ১৫% এবং জিডিপির ন্যূনতম ৩.৫% থেকে ৪%-এ উন্নীত করা

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে বিষয়ভিত্তিক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্যে স্বাধীন ‘শিক্ষা সেবা কমিশন’ গঠন করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানের পদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা

উচ্চশিক্ষায় মেধা ও চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহারিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে ভর্তি হওয়া মেয়েদের জন্য সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ ও স্টাইপেন্ড ব্যবস্থা চালু করা

শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে ইন্টার্নশিপ ও ব্যবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা

গ্রামীণ ও শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার আইসিটি বৈষম্য দূর করতে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবগুলোর কার্যকারিতা তদারকি নিশ্চিত করা

একটি দেশের শিক্ষা সংস্কার সামাজিক বিনিয়োগের বাইরে জাতির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ, নারী শক্তিকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক কাজে রূপান্তর এবং মানসম্মত গবেষণা প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম একটি প্রযুক্তিগত ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

লেখক: আতাউর রহমান মিন্টু, বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক।

Related News

মহানবী (সা.)-এর সাম্য ও মানবিকতার শিক্ষাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাণী, মহানবী (সা.)-এর শান্তি, সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৬-দফা কৌশল ও জাতীয় নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

কক্সবাজার ও ভাসানচরের ১১.৮০ লাখ রোহিঙ্গা সংকট, আরাকান আর্মির উত্থান এবং সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ও ৬-দফা কৌশলের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি ও সার্কের নতুন সম্ভাবনা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সার্ক মহাসচিবের বিদায়ী সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শক্তিশালী সার্ক গড়ার প্রতিশ্রুতি, জিয়াউর রহমানের অবদান স্মরণ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ! বিশ্ব অর্থনীতিতে বাড়ছে উদ্বেগ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। সুদের হার বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ও মার্কিন ঋণ সংকট নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাজপথের প্রতিবাদ থেকে দলীয় নীতি-নির্ধারণী কেন্দ্রবিন্দুতে রুহুল কবির রিজভী : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক বিকাশ ও সাংগঠনিক বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৃণমূলের আন্দোলন এবং রাজপথের কঠিন পরীক্ষা অতিক্রম করে দলীয় মূল নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে উন্নীত নেতাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গণতান্ত্রিক বিজয়ের শুভ সূচনা: নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উষ্ণ অভিনন্দন

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয়, নির্বাচনের ফলাফল ও নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকিং খাতে আমূল সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ

সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১.৫১ লাখ কোটি টাকায় বৃদ্ধি, কারণ ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

নারীর নিরাপদ যাতায়াত ও আত্মনির্ভরশীলতা ‘পিংক বাস’ সার্ভিসের নতুন সম্ভাবনা ও টেকসই বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিআরটিসির নারী চালক চালিত পিংক বাস সার্ভিস, ঢাকা-চট্টগ্রাম-বগুড়ার রুট, নারীদের যাতায়াতের নিরাপত্তা ও অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search