মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভারসাম্য : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
সরকারি কর্মচারীদের ১০০% পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবনা, নবম জাতীয় বেতন স্কেলের যৌক্তিকতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।
একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন ও প্রবৃদ্ধিশীল সমাজের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো গণপরিবহনে নারীদের অবাধ, সম্মানজনক ও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে প্রতিদিন কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক প্রয়োজনে বের হওয়া লাখ লাখ নারী যাত্রীকে গণপরিবহনে চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। বাসের আসন সংকট, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, কন্ডাক্টর ও পুরুষ সহযাত্রীদের অনাকাঙ্ক্ষিত হেনস্তা কিংবা খারাপ স্পর্শের যে নিত্যনৈমিত্তিক ভয়ভীতি—তা নারীদের স্বাধীন চলাফেরা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) কর্তৃক নারী চালক, নারী কন্ডাক্টর ও কেবল নারী যাত্রীদের নিয়ে ‘পিংক বাস’ (মহিলা বাস সার্ভিস) চালুর সিদ্ধান্তটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়, সংবেদনশীল ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি রুটে ১৪টি বিশেষ বাস নিয়ে এই সেবার যাত্রা শুরু হয়েছে। তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিকটি হলো—এখানে কেবল যাত্রী নারী নন, বরং বাসের চালক, কন্ডাক্টর এবং ভাড়া সংগ্রাহক—সবাই নারী। বিআরটিসি থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উচ্চশিক্ষিত নারীরা সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও পারিবারিক বাধা পেরিয়ে চালকের আসনে বসে যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন, তা বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নে এক নতুন ও ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করেছে।
অতীতে গণপরিবহনে ঘটে যাওয়া নানা নেতিবাচক ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারীবান্ধব পরিবেশের অভাবই ছিল প্রধান সমস্যা। নতুন এই পিংক বাসে সিসি (CC) ক্যামেরা, ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (VTS) এবং ই-টিকিটিং ব্যবস্থার সংযোজন বাসগুলোকে অনেক বেশি নিরাপদ ও আধুনিক করে তুলেছে। এছাড়া নির্দিষ্ট ১০৬টি স্টপেজে বাস থামার সুনির্দিষ্ট রুট ম্যাপ নারী যাত্রীদের যাতায়াতকে আরও পরিকল্পিত করবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ ও ২০০১ সালেও বিআরটিসি পরীক্ষামূলকভাবে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করেছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত বাস না থাকা, পুরুষ চালক-সহকারী নির্ভরতা, লিজ গ্রহীতাদের অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে সেই উদ্যোগটি সফলতার মুখ দেখেনি। এবার যেন সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা অত্যন্ত জরুরি।
নারী বাস চালক বা সহকারীদের প্রতি সমাজের একাংশের নেতিবাচক মনোভাব বদলাতে হবে। গণপরিবহন চালানো কোনো একক লিঙ্গের পেশা হতে পারে না—এই চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। একই সাথে ৩টি জেলায় ১৪টি বাস অত্যন্ত সীমিত। ইভি (ইলেকট্রনিক বাহন) বাস বহরে যুক্ত করে আগামীতে বাসের সংখ্যা ৫০টিতে উন্নীত করা এবং সারাদেশের প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহরে এই সেবা ছড়িয়ে দেওয়া সময়ের দাবি।
নারীর জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা কেবল দয়ার বিষয় নয়, এটি তাদের মৌলিক অধিকার। ‘পিংক বাস’ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে সরকার তাদের নির্বাচনী ও সামাজিক যে অঙ্গীকার বাস্তবায়ন শুরু করেছে, তার সুফল ধরে রাখতে বিআরটিসিকে পেশাদারিত্ব ও সততার সাথে তদারকি চালাতে হবে।
বাসের সিডিউল ঠিক রাখা, পর্যাপ্ত বাস বাড়ানো এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এই সার্ভিসকে একটি টেকসই মডেলে রূপান্তর করতে হবে। নারী চালক ও যাত্রীদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় সড়ক নিশ্চিত হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।