আমেরিকার ২৫০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন, পপ সংস্কৃতি এবং ক্রীড়া উন্মাদনার ভিড়ে আড়ালে পড়ে যাচ্ছিল দেশটির অর্থনৈতিক সংকটের বেশ কিছু গভীর সূচক। কিন্তু মার্কিন জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার (৪০ লাখ কোটি) অতিক্রম করার পর তা বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের চিন্তার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ প্রথম ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে প্রায় ২০০ বছর লেগেছিল। অথচ বর্তমানে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০ হাজার ডলার এবং প্রতিদিন প্রায় ৭৮০ কোটি ডলার হারে বাড়তে থাকা এই ঋণ এখন মার্কিন অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত রাখার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয় বৃদ্ধি, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট ও মহামারির অভিঘাত মোকাবিলা এবং কর হ্রাসের কারণে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে এক বিশাল ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন বাজেটের ওপর চাপ ফেলছে না, বরং বিশ্বজুড়ে ঋণের খরচ বাড়িয়ে বৈশ্বিক বাজারেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এখন ৪১.১ ট্রিলিয়ন ডলারের সংবিধিবদ্ধ সীমা স্পর্শ করার কাছাকাছি। ঋণের সুদের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকায় দেশটির ঋণ পরিশোধের ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রায় ২০ শতাংশই এখন চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ মেটাতে, যা দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি। বাজারে প্রযুক্তি খাতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিপ্লবের জন্য ঋণ নেওয়ার আগ্রহ এবং সরকারের বন্ড বিক্রির প্রচেষ্টা মুখোমুখি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার আরও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঋণ নেওয়ার বাড়তি খরচ বিশ্বব্যাপী সুদের হারকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে সাধারণ পরিবারের গৃহঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বাড়ছে, যার মাশুল আলবাত গুনতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং মার্কিন ডলার প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হওয়ার কারণে দেশটি এখনও তাৎক্ষণিক দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে নেই, যাকে অর্থনীতিবিদরা “হলুদ সতর্কসংকেত” হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বন্ড পুনঃক্রয় বা তাৎক্ষণিক আর্থিক কৌশল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাজস্ব ব্যবস্থার টেকসই সমন্বয় ছাড়া কেবল ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটানোর প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন ও রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে কর বৃদ্ধি বা ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের দ্রুতই রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট-সংকোচন পরিকল্পনায় আসতে হবে। অন্যথায় এই ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত মার্কিন জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক ।