সাবেক এমপি আজিজুল হককে আটক করে পুলিশে দিল ছাত্রদল
রাজধানীর লালমাটিয়ায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার মো. আজিজুল হককে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের সময় নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিই তালাবদ্ধ ছিল। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে রোগী ও স্বজনেরা নিচে নামতে গিয়ে এসব সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেননি। ফলে একটি সিঁড়ি দিয়ে একসঙ্গে নামার চেষ্টা করায় আতঙ্ক, হুড়োহুড়ি এবং ভোগান্তি বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
সোমবার বিকেলে হাসপাতালের নতুন ভবনের একটি লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগার পর এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার সকাল সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত হাসপাতালটিতে অবস্থান করে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও চারটি সিঁড়ি বন্ধ থাকার কথা স্বীকার করেছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তার কারণে দুটি সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আটতলা নতুন ভবনে সাতটি লিফট ও পাঁচটি সিঁড়ি রয়েছে। লিফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরের। পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে একটি নিয়মিত ব্যবহৃত হতো। বাকি চারটির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে গ্রিল লাগিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।
মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে এখনো তালা ঝুলছে। কয়েকটি গেটে মরিচাও ধরেছে। সোমবার অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনেরা কয়েকটি গেট ও তালা ভেঙে বের হয়েছেন। কোথাও কোথাও ভাঙা গেটের চিহ্নও দেখা যায়।
হৃদ্রোগ বিভাগে দায়িত্ব পালন করা এক নার্স বলেন, আগুনের সময় একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে রোগীরা হতাহত হয়েছেন। সব সিঁড়ি খোলা থাকলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না। তবে কেন সিঁড়িগুলো বন্ধ রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
ময়মনসিংহ নগরের চর ঈশ্বরদিয়া গ্রামের জোবেদা খাতুন গত রোববার হৃদ্রোগ বিভাগে ভর্তি হন। অগ্নিকাণ্ডের সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, আগুন লাগার পর ভবনের ভেতরে থাকা রোগী ও স্বজনেরা আতঙ্কিত হয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কয়েকটি গেট তালাবদ্ধ থাকায় তাঁরা আটকে পড়েন। পরে মানুষ তালা ও গেট ভেঙে বের হন।
জোবেদা বলেন, আগুন দেখে মনে হচ্ছিল কেউ বাঁচবে না। সবাই দৌড়াদৌড়ি করে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। গেটগুলো খোলা থাকলে তাঁদের কষ্ট অনেক কম হতো।
হাসপাতালের ছয়তলার ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ভাতিজিকে নিয়ে ভর্তি আছেন তারাকান্দার মনির হোসেন। তাঁর ভাষ্য, আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনেরা বিভিন্ন জায়গা দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় ভাঙা বেড, বেডশিটসহ বিভিন্ন জিনিস সিঁড়িতে পড়ে থাকায় অনেকে আহত হন। নামার সময় একজনের ওপর আরেকজন পড়ে যাচ্ছিলেন। শিশুদের নিয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
মনির হোসেন প্রশ্ন তোলেন, ‘একটা মেডিকেলের সিঁড়ি তালা মারা থাকবে কেন? যার যার ওয়ার্ডের পাশে সিঁড়ি আছে। সিঁড়িগুলো খোলা থাকলে মানুষ যার যার মতো করে নিচে নামতে পারত।’
ভালুকার পাঁচগাঁও গ্রামের রাজিয়া খাতুন তাঁর নাতনিকে নিয়ে হাসপাতালের অষ্টম তলার হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। তিনি বলেন, আগুন লাগার পর শিশুদের নিয়ে তাঁরা একটি কক্ষের এক কোণে সরে যান। আগুনের তাপ ও ধোঁয়ায় পুরো জায়গা অন্ধকার হয়ে যায়। নিচে নামার কোনো সুযোগ পাননি তাঁরা।
রাজিয়ার ভাষ্য, নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েকজন তাঁদের এক কোণে নিয়ে রাখেন। সেখানে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন মানুষ ছিলেন। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে অনেকে বমি করছিলেন, কারও মাথা ঘুরছিল। শিশুদেরও শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে তাঁদের আবার ওয়ার্ডে নেওয়া হয়।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, নতুন ভবনে পাঁচটি সিঁড়ি ও সাতটি লিফট রয়েছে। সাতটি লিফটের মধ্যে একটি বিকল ছিল এবং সেটি মেরামতের কাজ চলছিল। ওই লিফটের কন্ট্রোল রুমেই আগুন লাগে।
ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে এটিই আগুনের প্রকৃত কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
মাইনউদ্দিন খান বলেন, পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে একটি দিয়ে নিয়মিত মানুষ চলাচল করেন। অন্যগুলো সাধারণত ব্যবহার করা হয় না এবং নিরাপত্তার কারণে বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর মঙ্গলবার সেগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, লিফটে আগুন লাগার পর লিফট হলের মাধ্যমে বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ও আগুনের ঝিলিক দেখা যায়। এতে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সব সিঁড়ি খোলা থাকলে তাঁরা সহজেই নিচে নামতে পারতেন। তবে নিরাপত্তার কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুটি সিঁড়ি বন্ধ রেখেছিল।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লিফটের কন্ট্রোল বোর্ড ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশে আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। লিফটের কেব্লের মধ্যে আগুন লেগে তা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এদিকে লিফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় ১১ নম্বর লিফটটি সচল ছিল না। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সেটি বন্ধ ছিল। সেখানে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হলো, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তিনি জানান, লিফট বন্ধ থাকলেও এর বিদ্যুৎ-সংযোগ বন্ধ ছিল না। ফলে কন্ট্রোল রুমের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলোতে বিদ্যুৎ-সংযোগ সচল ছিল। আগুনের কারণ নির্ধারণে বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হবে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। তদন্তের পর আগুনের প্রকৃত কারণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা আরও স্পষ্ট হবে।