কুমিল্লায় ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সমগ্র জাতির বিবেককে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। সামান্য একটি মুঠোফোনের লোভে সপ্তম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় হত্যা করার ঘটনা কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা, কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপরাধ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার নগ্ন রূপ। অপ্রতিমের স্বজনদের এই অপূরণীয় ক্ষতি ও শোকের মুহূর্তে আমরা গভীর সমবেদনা জানাই।
যদিও পুলিশ সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার ও আলামত উদ্ধার করেছে, তবে অপরাধ ঘটার পর আসামি গ্রেপ্তার করাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একমাত্র সফলতা হতে পারে না। আসল প্রশ্ন হলো—একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে কেন জীবিত উদ্ধার করা গেল না?
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা সত্ত্বেও তাকে জীবিত উদ্ধার করতে না পারা পুলিশি ব্যবস্থার গতিশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। নিখোঁজ সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশের ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর প্রতিক্রিয়া কতটা দ্রুত ও সমন্বিত ছিল, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা দরকার।
শিশু নিখোঁজের ক্ষেত্রে ‘মুন অ্যালার্ট’ এবং জরুরি হেল্পলাইনগুলোর কার্যকারিতা কেবল কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না; এগুলোকে বাস্তবমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম আট মাসেই ৩৬ জন নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার এবং মোট ১৫৫ জন শিশুর প্রাণহানির ঘটনা প্রমাণ করে যে দেশের শিশুরা কতটা অরক্ষিত। এর পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে ২৯৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হওয়া জননিরাপত্তার মারাত্মক ক্ষয় নির্দেশ করে।
এই ঘটনায় জড়িতদের বয়স আবারও প্রমাণ করেছে যে কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কত গভীর। কেবল কয়েকজন কিশোরকে আটক করে অভিযান শেষ করলে মূল সমস্যার সমাধান হবে না; এদের পেছনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক, মাদক চক্র, জুয়া ও অপরাধের অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
অপ্রতিম হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। তবে এর চেয়েও বড় দায়িত্ব হলো এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা, যাতে আর কোনো সন্তানকে অকালে ঝরে পড়তে না হয়। প্রতিটি শিশুর নিরাপদে ঘর থেকে বের হওয়া এবং নিরাপদে ঘরে ফিরে আসার নিশ্চিন্ত অধিকার নিশ্চিত করতেই হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।