জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় তেলের দাম বৃদ্ধি, সরকারের অবস্থান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ মানুষের আয়ের পরিমাপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।
কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক হত্যা এবং কাপ্তানবাজারে ‘ক্রাইম সেটআপ’ নামক কিশোর গ্যাংয়ের রামদা ও চাপাতি নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়ার ঘটনা কেবল কুমিল্লা শহরের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও কিশোর অপরাধের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। সামান্য একটি আইফোন ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা থেকে সপ্তম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে প্রাণ দিতে হওয়া কিংবা ‘কিং স্কোয়াড’, ‘আর স্কোয়াড’-এর মতো ২০টিরও বেশি কিশোর গ্যাংয়ের মহড়া জনজীবনকে চরম আতঙ্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও মানবধিকার সংগঠন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হওয়া এবং উদ্ধারকৃত লাশের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মারাত্মক অপরাধমূলক গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।
এই ব্যাধি কেবল সাধারণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়; এটি সমাজ, পরিবার, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর এক বিষাক্ত সামাজিক নেটওয়ার্কের ফলাফল।
টিকটক, লাইকিসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিলস তৈরি ও সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার নেশায় কিশোরেরা সহিংস গ্যাং কালচারে আকৃষ্ট হচ্ছে। পুলিশি তদন্তেই দেখা গেছে, কিশোর গ্যাংগুলোতে কেবল অপ্রাপ্তবয়স্করা থাকে না; বরং তাদের পেছনে ১৯ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী ও মাদক কারবারিরা থাকে। তারা কিশোরদের অস্ত্র সরবরাহ করে নিজেদের মাদক ব্যবসা ও এলাকা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
অনেক পরিবারে সন্তানদের বেপরোয়া আচরণ, অনিয়ন্ত্রিত ডিভাইস ব্যবহার, অসংগতিপূর্ণ বাইক ও দামী ফোন ক্রয়ের অর্থ জোগানের বিষয়ে অভিভাবকীয় নজরদারির মারাত্মক অভাব রয়েছে। বয়সের বড় ব্যবধানে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের সাথে অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের ‘অসম বন্ধুত্ব’ কিশোরদের সহজে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পথ তৈরি করছে।
কিশোর গ্যাংয়ের এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে হলে কেবল কয়েকটি চিহ্নিত অপরাধীকে গ্রেপ্তারের মধ্যে প্রশাসনিক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সরকারকে একটি বহুমুখী ও কঠোর সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে থাকা পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী, রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী ও মাদক কারবারিদের অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার করতে হবে। নিখোঁজ সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এ পুলিশের তাৎক্ষণিক মোবাইল ট্র্যাকিং ও ‘মুন অ্যালার্ট’-এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সহিংসতা বা অস্ত্রের মহড়াসংক্রান্ত যেকোনো কন্টেন্ট ব্লক করার আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
পুলিশের পরামর্শ অনুযায়ী অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি অতিরিক্ত সচেতন হতে হবে—সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে তা নজরদারিতে রাখতে হবে। পাশাপাশি স্কুলে খেলার মাঠ, সংস্কৃতি চর্চা ও মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং চালু করতে হবে। শিশু-কিশোর সংক্রান্ত অপরাধের বিচারে ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী পার পেয়ে যাওয়ার সাহস না পায়।
অপ্রতিমের মায়ের সেই করুণ আকুতি—”তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন?”—সমগ্র রাষ্ট্রের বিবেকের কাছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। কোনো মা-বাবাই চান না তাঁদের সন্তানের শেষ পরিণতি এমন ভয়াবহ হোক।
সময় গড়িয়ে যাওয়ার আগেই সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে কিশোর গ্যাং এবং এর পেছনের গডফাদারদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালাতে হবে। একটি নিরাপদ ও শঙ্কাহীন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।