খেলাপি ঋণের পাহাড় ও ব্যাংকিং খাতের সংকট: কাগজের শিথিলতা নয়, চাই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি
বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও সংকটাপন্ন ঋণের সর্বশেষ চিত্র, কাঠামোগত ত্রুটি এবং ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে চার দফা জরুরি সুপারিশ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সাথে টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি ও টক শোর আলোচকদের সাম্প্রতিক মতবিনিময় সভাটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনকাঠামো ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত সময়োপযোগী আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ চলমান থাকলেও, একক রাষ্ট্রব্যবস্থার বাংলাদেশে উচ্চকক্ষ বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের যৌক্তিকতা এবং এক ব্যক্তির টানা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার প্রস্তাবনা নিয়ে যে বহুমাত্রিক যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, তা ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পরিচয় বহন করে।
স্বরাষ্ট্র ও সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে আয়োজিত এই সভায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ইস্যুগুলোতে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও সুশীল সমাজের স্পষ্ট মতামত গ্রহণ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াটি কেবল কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং এতে সার্বজনীন নাগরিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন।
জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হলেও, মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা এর কার্যকারিতা ও রাষ্ট্রের অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন।
বাংলাদেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদই যেখানে গত কয়েক দশকে পুরোপুরি কার্যকর ভূমিকা রাখতে হিমশিম খেয়েছে, সেখানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কতটুকু গুণগত পরিবর্তন আনবে—তা গভীরভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
তবে ক্ষমতার একক কেন্দ্রিকতা ভাঙতে এবং আইন প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর উচ্চকক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। সংসদীয় রাজনীতিতে ভারসাম্য আনতে এই প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর (বা দুই মেয়াদ) প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন—এই প্রস্তাবটিকে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপির প্রস্তাবিত এই নীতিটি মূলত ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ ও ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধের চেতনা থেকেই উদ্ভূত। যদি একজন ব্যক্তির হাতে দীর্ঘকাল অপরিসীম ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কেউ কেউ সর্বোচ্চ মেয়াদের বাধ্যবাধকতাকে অগণতান্ত্রিক বলে মত দিলেও, বাংলাদেশের ক্ষমতার ইতিহাস বিবেচনায় এই ধরনের মেয়াদের সীমা নির্ধারণ সুশাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।
সংবিধান সংশোধন কেবল কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের রাজনৈতিক দস্তাবেজ নয়; এটি আগামী প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণী ভিত্তি। বিরোধী দলসহ সকল অংশীজনকে কার্যকর সংলাপে অন্তর্ভুক্ত করে এবং জুলাই সনদের মূল চেতনা অক্ষুণ্ণ রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংবিধান তৈরি করাই হোক জাতীয় অগ্রাধিকার। আলোচনা-সমঝোতার মাধ্যমে এমন এক গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো রাজনৈতিক স্বৈরাচারী প্রবণতাকে শক্তহাতে রুখে দিতে সক্ষম হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।