প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বেঁধে দেওয়া ঠিক হবে না : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার বিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থায়ী রূপরেখা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একের পর এক হামলা, জমি দখল, ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মিরপুরের ঐতিহাসিক রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, আদাবরে বহুতল ভবন দখলের চেষ্টা কিংবা মোহাম্মদপুরে প্লট ভাঙচুর—এসব ঘটনাই জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন হাজির করেছে।
বিশেষ করে, এসব নজিরবিহীন হামলায় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নাম আসা এবং সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে প্রকাশ্যে ‘দুঃখ প্রকাশ ও বিব্রত হওয়ার’ কথা স্বীকার করা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও দলীয় শৃঙ্খলার ওপর চরম ধাক্কা নির্দেশ করে।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শর্তই হলো নাগরিকদের জীবন, সম্পত্তি ও অধিকারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। প্রধান উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হলেও মাঠপর্যায়ে অরাজকতা দমনে দৃশ্যমান ও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপের অভাবে নাগরিক সমাজের ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে কোনো নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে বা স্থাপনা ভাঙচুর হলে সরকার বিব্রত এবং দুঃখিত, কারণ নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারেরই ছিল।
সরকারের এই সৎ স্বীকারোক্তি প্রশংসনীয় হলেও কেবল দুঃখ প্রকাশ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে প্রতিটি ঘটনায় অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের তোপের মুখে অপরাধীদের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় নিয়ে আসাই এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘ দিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দেশ পরিচালনায় এসে যদি স্থানীয় নেতা-কর্মীরাই দখলদারি ও নৈরাজ্যে জড়িয়ে পড়েন, তবে তা সরকারের অর্জিত সকল সাফল্যকে ম্লান করে দেয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির অভ্যন্তরীণ বৈঠক এবং সরকারি ব্রিফিংয়ে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই সতর্কবার্তার প্রয়োগ না ঘটলে তা কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
১৭ বছরের বৈরী আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশ পরিচালনার বিশাল দায়িত্ব পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অপকর্ম থেকে নিবৃত্ত করা দলের নিজেদেরই অস্তিত্ব রক্ষা ও সুশাসনের প্রধান শর্ত।
রাজনৈতিক পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে অপরাধীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করাই এই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ। সরকারকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে তারা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি সক্ষম। একই সাথে, ক্ষমতাসী দল হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধে জড়িতদের দল থেকে আজীবন বহিষ্কার করে আইনি প্রক্রিয়ার মুখে দাঁড় করানো না গেলে, সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।