ঐতিহ্য থেকে আধুনিক ফ্যাশন চুলের সাজে বেণির যুগান্তর
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক বেণি এখন আধুনিক ফ্যাশনেরও অন্যতম ট্রেন্ড। চেহারার গঠন ও পোশাক অনুযায়ী কেমন বেণি মানানসই, জেনে নিন বিস্তারিত।
ফিচার: মাধবকুণ্ড বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পাহাড়ি বুক চিরে নেমে আসা এক মনোরম জলধারা, পানির কুয়াশার চাদর আর পর্যটকদের আনন্দমুখর মুহূর্ত। তবে একজন বন্য প্রাণিবিদের কাছে এই জলপ্রপাত শুধু একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রই নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার। দিনের আলোয় পর্যটকদের কোলাহলপূর্ণ এই ইকোপার্কটি সূর্য ডুবতেই রূপ নেয় এক ভিন্ন ও রহস্যময় নিশাচর জগতে।
সাম্প্রতিক এক মাঠপর্যায়ের জরিপে দেখা গেছে, বৃষ্টির দিনেও মাধবকুণ্ডে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। মানুষের এই পদচারণায় বন্য প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দিনের বেলায় ছোট দলের চশমাপরা হনুমান, পর্যটকদের ফেলে দেওয়া পেয়ারা খাওয়া কাঠবেড়ালি কিংবা গাছের পাতায় কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকা নিশাচর লজ্জাবতী বানরের দেখা মেলে। এছাড়া এখানে দেখা মিলেছে চঞ্চলমতি মখমল-কপাল কীটকুড়ানি (Velvet-fronted Nuthatch) পাখির, যারা গাছের বাকল থেকে ছোট কীটপতঙ্গ ও লাইকেন সংগ্রহ করে খায়। তবে পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দিনের বেলা জলপ্রপাত বা আশপাশের এলাকায় উভচর বা বড় বন্য প্রাণীদের বিচরণ অনেকটাই কমে যায়।
সন্ধ্যার পর পর্যটকদের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় মাধবকুণ্ডের পুরো দৃশ্যপট। জলপ্রপাতের তীব্র গর্জন আর ঝিঁঝি পোকার ডাকে মুখরিত হয়ে ওঠা পাহাড়ি বনে শুরু হয় আসল বন্য প্রাণের জীবন।
শীত বা বর্ষার রাতে পাহাড়ের ঝোঁপঝাড় ও পানির ধারে চোখা-মাথা পাহাড়ি ব্যাঙের মতো বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
রাতে গাইডদের সহায়তায় বিষধর সবুজ বোড়া (Green Pit Viper), কালকেউটে (Krait), লম্বায় প্রায় দেড় ফুটের কাঠিপোকা, ছোট গন্ধগোকুল বা ভামের দল এবং পোকামাকড় শিকারে ব্যস্ত লজ্জাবতী বানরের দেখা মেলে।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরও বন উজাড়, চা-বাগানের বিস্তার এবং মানুষের নানা চাপের কারণে মাধবকুণ্ডের প্রাকৃতিক মিশ্র চিরহরিৎ বন ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। একসময় এই বৃহত্তর পাথারিয়া পাহাড়ে হাতি, গন্ডার, বুনো মহিষ, বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক ও সাম্বারের মতো বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অবাধে বিচরণ করলেও আজ তারা স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত। তবে বড় প্রাণী হারিয়ে গেলেও ছোট ও অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত প্রাণীদের জন্য অবশিষ্ট এই বনভূমির গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের প্রাণিকুলের লাল তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চালানো এই জরিপ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—একটি স্থান কি একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র এবং বন্য প্রাণীর আবাস হতে পারে? বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন নিজে জীববৈচিত্র্যের শত্রু নয়, যদি তা পরিবেশের ধারণক্ষমতা মাথায় রেখে পরিচালিত হয়। ঝরনার আশপাশের সংবেদনশীল প্রজননস্থল, ছড়া, জলাশয় ও নিশাচর প্রাণীদের আবাসস্থল বিশেষভাবে সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
মাধবকুণ্ডের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—আমরা শুধু দৃশ্যমান জলপ্রপাতটি সংরক্ষণ করব, কিন্তু চারপাশের গাছপালা, ঝোপঝাড় ও অন্ধকার রাতের পরিবেশ হারিয়ে ফেললে একদিন অদৃশ্য প্রাণভুবন চিরতরে হারিয়ে যাবে। সত্যিকারের ইকোপার্ক হিসেবে মাধবকুণ্ডকে বাঁচাতে হলে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে এর জীবন্ত বনকেই।