মাল্টার চেয়ে ১৪৬ গাড়ি আমদানিতে শুল্ক কর কম
প্রতি কেজি মাল্টার আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা হলেও শুল্ক-কর দিতে হচ্ছে প্রায় ১০৭ টাকা। মোট শুল্ক-করভার ১২১.৭৮ শতাংশ, যা ১৪৬টি গাড়ির চেয়েও বেশি।
অর্থনীতি: একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ আরও উন্নত করা জরুরি।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ দেশের অর্থনীতি, দারিদ্র্য, সামাজিক সুরক্ষা ও সংস্কার অগ্রাধিকারের পাশাপাশি এআইনির্ভর উন্নয়নের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। একই দিনে প্রকাশিত দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যেও অঞ্চলটির প্রবৃদ্ধি চলতি বছরে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৪ শতাংশে রেখেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রমের গতি বাড়লে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ কার্যক্রমের ধীরগতি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে দেশের বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে কিছুটা সুরক্ষা দিলেও দরিদ্রতম পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ এখনো এসব কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আরও কার্যকর লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলে একই সরকারি ব্যয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে সহায়তার পরিমাণ ও কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান খাদ্য ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা কর্মসূচির সমন্বয় করা হলে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় আওতার ঘাটতি কমানো এবং প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসম দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতাকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের চাপ বেড়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি দুর্বল হয়েছে এবং শ্রমবাজারে বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এ অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সেই সহায়তা যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাকে সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বিশ্বব্যাংক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে; ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োহানেস জুট বলেন, বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়া স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে দক্ষতা, অবকাঠামো ও সহায়ক ব্যবসায়িক পরিবেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় এ অঞ্চলের অবস্থান এখনো পিছিয়ে। শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষির মতো খাতে জনসেবা উন্নত করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে এআই-সহায়তায় রেটিনাল স্ক্রিনিংয়ের মতো জনসেবামূলক উদ্যোগের উদাহরণও তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নের মূল বার্তা হলো—শুধু সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় বাড়ানো নয়, বরং বিদ্যমান অর্থ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা জরুরি। ফ্যামিলি কার্ড, ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি এবং বিভিন্ন ভর্তুকি ও নগদ সহায়তার সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়া গেলে সীমিত সরকারি সম্পদে দারিদ্র্য কমানোর প্রভাব বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি।