পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালের রাজনীতিতে এক চরম নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। নিজের রাজনৈতিক গুরু ও দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকোকে আকস্মিক বরখাস্ত করার পর দেশটিতে এক প্রবীণ অর্থনীতিবিদকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে। গতকাল সোমবার (২৫ মে) রাতে জারি করা এক বিশেষ রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আহমাদু আল আমিনু লুকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ফায়ে তাঁর এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের সপক্ষে দাবি করেছেন, দেশের বর্তমান চরম অর্থনৈতিক সংকট, আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা কাটিয়ে ওঠার জন্য এই মুহূর্তে আহমাদু লুর মতো একজন দক্ষ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদের প্রয়োজন ছিল। এর আগে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকোর সঙ্গে বেশ কয়েক মাসের তীব্র নীতিগত টানাপোড়েন শেষে গত শুক্রবার তাঁকে বরখাস্ত করেন ফায়ে। একই সঙ্গে তিনি পুরো সরকার ভেঙে দিলে দেশটিতে এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়।
নতুন প্রধানমন্ত্রী আহমাদু লু অতীতে দীর্ঘদিন ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস’-এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। নিয়োগ পাওয়ার পর দেওয়া তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আর্থিক পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন হলেও সেনেগাল একটি নিরাপদ ও টেকসই দেশ এবং এটি বজায় থাকবে।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, এটি সরকারের মৌলিক নীতির কোনো বদল নয়, বরং লক্ষ্য অর্জনে কাজের পদ্ধতির পরিবর্তন মাত্র।
বর্তমানে সেনেগালের ঋণের পরিমাণ তাদের মোট জিডিপির ১৩২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে ফায়ে ও সোনকো যৌথভাবে ক্ষমতায় এসে তৎকালীন আগের সরকারের বিরুদ্ধে প্রকৃত ঋণের তথ্য গোপন করার গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন। এই জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৮০ কোটি ডলারের একটি অত্যন্ত জরুরি সহায়তা কর্মসূচি মাঝপথেই স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ফায়ে আইএমএফের সঙ্গে নতুন করে ঋণ নেওয়ার শর্ত নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী হলেও, সোনকো দেশের অভ্যন্তরেই নিজস্ব ও সার্বভৌম অর্থনৈতিক সমাধানের পক্ষে কট্টর অবস্থান নিয়েছিলেন। মূলত এই অর্থনৈতিক মতবিরোধই একসময়ের দুই ঘনিষ্ঠ নেতার মাঝে স্থায়ী দূরত্ব তৈরি করে দেয়।
প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারিত হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে ছিটকে যাননি ওসমান সোনকো। আজ মঙ্গলবার সেনেগালের পার্লামেন্টে সোনকোকে নতুন স্পিকার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে কি না—তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। গত রোববার স্পিকার এবং সোনকোর ঘনিষ্ঠ মিত্র এল মালিক এনদিয়ায়ে আকস্মিক পদত্যাগ করায় সোনকোর জন্য এই নতুন পথ উন্মুক্ত হয়।
১৬৫ আসনের সেনেগালিজ পার্লামেন্টে সোনকোর নিজস্ব দল ‘পাস্তেফ’-এর ১৩০ জন আইনপ্রণেতা থাকায় তাঁর স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। তবে দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলো একে একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র বিরোধিতা করছে। প্রধান বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতা আয়েসাতা তাল সাল এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সোনকোর সরাসরি স্পিকার পদের জন্য দাঁড়ানো সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এই আইনি বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ফায়ের উচিত অবিলম্বে দেশটির সাংবিধানিক কাউন্সিলের দ্বারস্থ হওয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্পিকার নির্বাচিত হলে সোনকো পার্লামেন্টে নিজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে সরাসরি প্রেসিডেন্ট ফায়ের নির্বাহী কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। এ ছাড়া সম্প্রতি দেশটির নির্বাচনী আইন সংশোধন করায় ২০২৯ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সোনকোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সব আইনি বাধাও কেটে গেছে। এর ফলে একসময়ের দুই পরম রাজনৈতিক মিত্র আগামী দিনে দেশের শীর্ষ পদের লড়াইয়ে একে অপরের মুখোমুখি বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।