সম্পাদকীয়

এফডিআই প্রণোদনা স্কিম ও মেডিকেল আইন সংশোধন: মন্ত্রিসভার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল, স্বনির্ভর ও শক্তিশালী করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে ‘প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রণোদনা স্কিম নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নীতিমালার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সাথে দেশের চিকিৎসা খাতের আধুনিকায়ন ও উচ্চতর গবেষণার মানোন্নয়নে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) আইন, ২০২৬’–এর খসড়ারও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই দুটি নীতিগত সিদ্ধান্ত দেশের শিল্পায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং স্বাস্থ্য খাতের স্বাবলম্বিতা অর্জনের ক্ষেত্রে এক নতুন ও যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

বিগত দিনগুলোতে বাংলাদেশের প্রবাসীদের মূলত ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যারা কেবল দেশে টাকা পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের এই নতুন নীতিমালার আওতায় প্রবাসী ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অনাবাসী বাংলাদেশিসহ দেশের সব সাধারণ নাগরিককে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ দেশে আনতে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখার এক অনন্য সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হলো।

এখন থেকে কোনো বাংলাদেশী নাগরিক বা প্রবাসী উদ্যোক্তা যদি আন্তর্জাতিক কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন বা বাণিজ্যিক প্রজেক্টে অর্থায়নে উদ্বুদ্ধ ও সফল করতে পারেন, তবে সরকার তাঁকে এই নীতিমালার আলোকে বিশেষ স্বীকৃতি ও আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ডলার সংকটের এই কঠিন সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সরকারের এই কৌশলগত উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এর মাধ্যমে প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, দেশের শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সরাসরি অংশ নেওয়ার আইনি সুযোগ লাভ করলেন। এটি প্রবাসীদের মেধা ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ককে দেশের স্বার্থে কাজে লাগানোর এক অসাধারণ ও দূরদর্শী মাস্টারস্ট্রোক।

একই বৈঠকে অনুমোদিত ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ দেশের চিকিৎসা শিক্ষার ইতিহাসে এক বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ঘটাতে যাচ্ছে। এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব অর্থায়নে মুনাফাভিত্তিক বা অমুনাফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসিত কোম্পানি বা সংগঠন গঠন করতে পারবে। একই সাথে এই ধরণের কোম্পানি বা সহযোগী সংগঠনের শেয়ার অর্জন, অংশীদারিত্ব ও পরিচালনার সুনির্দিষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যেই এই আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে।

এই আইনটি পাস হলে দেশের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব গবেষণালব্ধ ফলাফল বা ফার্মাসিউটিক্যালস আবিষ্কার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে নিজস্ব তহবিল গঠনে স্বাবলম্বী হতে পারবে. উন্নত বিশ্বে যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বনামধন্য ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জাম আবিষ্কার করে পেটেন্ট ও বাণিজ্যিক বিপণনের মাধ্যমে বিলিয়ন ডলারের নিজস্ব তহবিল গড়ে তোলে, বাংলাদেশও আজ সেই আধুনিক ও বৈশ্বিক ধারায় প্রবেশ করল। এর ফলে রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতের গবেষণা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।

বৈঠকের শেষ অংশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বিপুল ভোটে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পুরো মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন ও রাষ্ট্রীয় শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা একযোগে উল্লেখ করেন যে, বিশ্বমঞ্চের এই শীর্ষ পদে বাংলাদেশের এই বিজয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের কূটনৈতিক মর্যাদা ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে এক নতুন এবং সুদৃঢ় উচ্চতায় নিয়ে গেছে. চার দশক পর জাতিসংঘের এই শীর্ষ আসনে বাংলাদেশের আসীন হওয়া দেশের চলমান গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের এক বিশাল আস্থার বহিঃপ্রকাশ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে ৪ জুনের এই মন্ত্রিসভার বৈঠকটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য খাতের জন্য এক নতুন রোডম্যাপ তৈরি করে দিয়েছে। এফডিআই আনার ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিক ও প্রবাসীদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া এবং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাণিজ্যিক রূপান্তরের সুযোগ প্রদান—উভয় সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা থেকে বের হয়ে এসে আধুনিক, প্রগতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করছে।

আমরা আশা করব, এই খসড়া নীতিমালা ও আইনগুলো দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়িত হবে, যা স্বাধীন বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার পথকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Related News

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গণতান্ত্রিক বিজয়ের শুভ সূচনা: নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উষ্ণ অভিনন্দন

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয়, নির্বাচনের ফলাফল ও নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকিং খাতে আমূল সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ

সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১.৫১ লাখ কোটি টাকায় বৃদ্ধি, কারণ ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

নারীর নিরাপদ যাতায়াত ও আত্মনির্ভরশীলতা ‘পিংক বাস’ সার্ভিসের নতুন সম্ভাবনা ও টেকসই বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিআরটিসির নারী চালক চালিত পিংক বাস সার্ভিস, ঢাকা-চট্টগ্রাম-বগুড়ার রুট, নারীদের যাতায়াতের নিরাপত্তা ও অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভারসাম্য : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সরকারি কর্মচারীদের ১০০% পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবনা, নবম জাতীয় বেতন স্কেলের যৌক্তিকতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাজনীতি, শিক্ষা ও সংগ্রামের বর্ণাঢ্য জীবন-অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুপরিচিত ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতির মাঠে নানা প্রতিকূলতা, কারাবাস ও আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য…

প্রাথমিকে আধুনিক সংস্কার ও নতুন দিগন্ত গুণগত শিক্ষার প্রত্যয়ে সময়োপযোগী উদ্যোগ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

প্রাথমিক শিক্ষার নতুন কারিকুলামে ইংরেজি স্পিকিং টেস্ট, ইউনিক আইডি ও গুণগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে ববি হাজ্জাজের ঘোষণার আলোকে বিশেষ সম্পাদকীয়।

৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরানোর আশ্বাস ও রাখাইনের বাস্তবতা: কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, চাই টেকসই প্রত্যাবাসন

মিয়ানমার জান্তা সরকারের ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার ঘোষণা, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের সংকট ও টেকসই সমাধানের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বক্তব্য, দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট, ক্যাপাসিটি চার্জ ও সমাধান নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search