সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা অনুপ্রবেশকারী ও অপশক্তির ষড়যন্ত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও ভাঙচুর, হাইব্রিড নেতাদের অপতৎপরতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২.৭৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি ব্যাংকিং সূচক নয়; এটি দেশের আর্থিক খাতের মারাত্মক নৈরাজ্য ও সুশাসনের চরম অভাবের এক নগ্ন দলিল।
প্রতি ১০০ টাকা ঋণের ৩৩ টাকাই ফেরত না আসার চিত্র বাংলাদেশকে খেলাপি ঋণের বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষে নিয়ে গেছে—যা ইউক্রেনের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চেয়েও ভয়াবহ। তার ওপর ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ৯১ হাজার ৮ধার কোটি টাকা (মোট ঋণের প্রায় ৬০%), যা স্পষ্ট করে যে পুনঃতফসিল, অবলোপন ও আদালতের স্থগিতাদেশের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে রাখার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এই বিপর্যয় কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং কাঠামোগত দুর্বলতা, অসাধু রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদূরদর্শী নীতির সম্মিলিত ফল।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া ৯০ দিনের শ্রেণীকরণ বিধির কারণে খেলাপি ঋণের সঠিক চিত্র আংশিক দৃশ্যমান হতে শুরু করেছিল। তবে গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের বিধি শিথিল করার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আবার পেছনের দরজায় ঠেলে দিয়েছে।
ডাউন পেমেন্টের হার ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ওপর ছেড়ে দেওয়া, পুনঃতফসিলের মেয়াদ ১০ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করা এবং ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ড প্রদানের মাধ্যমে মূলত বড় খেলাপিদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ ও ২০১৯ সালে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে বড় ঋণ নিয়মিত করার শিথিলতার ফলে খেলাপি ঋণ কমেনি, বরং বহুগুণ বেড়েছে। আদায়ের আইনি হাতিয়ারগুলো (যেমন ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন’ ও ‘অর্থঋণ আদালত আইন’-এর সংশোধনী) ঝুলিয়ে রেখে খেলাপিদের বারবার ছাড় দেওয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার অগ্রাধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তিনটি গুরুতর কাঠামোগত ত্রুটি এই খেলাপির সংস্কৃতিকে ত্বরান্বিত করেছে:
ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (CIB) ঋণদাতা ব্যাংক নিজেই তথ্য সরবরাহ করে, ফলে অসচ্ছতা আড়াল করা সহজ হয়।
ঋণগ্রহীতা নিজেই রেটিং সংস্থার ফি পরিশোধ করেন, যার ফলে ক্রেডিট রেটিং একটি স্বাধীন মূল্যায়নের বদলে কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়েছে।
নির্দিষ্ট কিছু শাখা ও বিশেষ গোষ্ঠী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেপরোয়া ঋণ নিলেও তদারকি কাঠামোর কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
এনবিআরের কর-ভ্যাট রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন, ইউটিলিটি বিল ও অর্থঋণ আদালতের ডেটা নিয়ে একটি স্বাধীন জাতীয় ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণসীমা ও সুদের হার নির্ধারণ করবে। ৩১ আগস্টের সার্কুলারটি সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে প্রভাব মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত স্থগিত রাখতে হবে। বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।
মিথ্যা ঋণতথ্য দাখিলকে স্বতন্ত্র শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে অনুমোদনকারী পরিচালক ও ব্যাংকারের ব্যক্তিগত জরিমানা ও আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের জরিমানা আমানতকারীর ওপর চাপ বাড়ায়। বড় ঋণের ক্ষেত্রে রেটিং সংস্থা নির্বাচন ও ফি পরিশোধ নিয়ন্ত্রক পরিচালিত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসতে হবে এবং রেটিং সংস্থাগুলোর ঐতিহাসিক নির্ভুলতার রেকর্ড প্রকাশ্যে আনতে হবে।
ভাঙা ব্যাংক মেরামতের আইনের চেয়ে ব্যাংক যাতে না ভাঙে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ একদিনে তৈরি হয়নি; এটি তৈরি হয়েছে প্রতিটি ভুল অনুমোদন ও জবাবদিহিহীনতার সুযোগে। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার আগেই ব্যাংকিং খাতে আইনি ও প্রশাসনিক আমূল সংস্কার আনা না হলে, জাতীয় অর্থনীতি এক অপূরণীয় ধসের মুখোমুখি হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।