দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলংকা—এই তিন দেশেরই প্রথাগত, কর্তৃত্ববাদী ও স্থবির রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে মূলত তরুণ ও ‘জেন জি’ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান। ব্যালট বাক্সে পরিবর্তনের এক বিশাল রায় বা ম্যান্ডেট নিয়ে এই তিন রাষ্ট্রেই নতুন সরকার গঠিত হয়েছে।
কিন্তু রাজপথের লড়াইয়ে স্বৈরাচারী শক্তির পতন ঘটানো যতটা বীরত্বগাথার, রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল গোলকধাঁধায় পড়ে জনগণের আকাশচুম্বী আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা যে তার চেয়ে বহুল গুণ কঠিন—ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় দেশ তিনটির নতুন শাসকরা তা সম্যক উপলব্ধি করছেন। প্রাথমিক বিজয়ের উল্লাস কেটে যাওয়ার পর এখন সামনে এসেছে ক্ষমতার রূঢ় বাস্তবতা, অর্থনৈতিক মন্দা ও ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতির এক অন্তহীন অগ্নিপরীক্ষা।
বিগত চার বছরে এই তিন দেশের পরিবর্তনের চালিকাশক্তি ছিল প্রায় একই—অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের অভাব। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা মুহূর্তের মধ্যে সরকারবিরোধী বয়ান তৈরিতে সফল হয়। তবে আন্দোলনের তাৎক্ষণিক অনুঘটকগুলো ছিল ভিন্ন:
শ্রীলংকা (২০২২): সম্পূর্ণ দেউলিয়া অর্থনৈতিক অবস্থা ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকটের মুখে রাজাপাকসে রাজবংশের পতন।
বাংলাদেশ (২০২৪): বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন যা পরবর্তীতে এক রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়।
নেপাল (২০২৫): মুক্তমত প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ‘টিকটক’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের এক হঠকারী সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জেন-জি প্রজন্মের সর্বাত্মক বিদ্রোহ, যা কে পি শর্মা অলির সরকারের পতন নিশ্চিত করে।
আন্দোলন-পরবর্তী মোড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও তিনটি দেশ তিনটি ভিন্ন আদর্শিক পথ বেছে নিয়েছে। নেপাল প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে একজন সাবেক হিপ-হপ র্যাপার বালেণ শাহকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছে। শ্রীলংকা বেছে নিয়েছে অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকরের মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী বামপন্থী আদর্শ। আর বাংলাদেশ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ভেতরেও এক ধরনের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রেখে দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতা তারেক রহমানকে ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছে।
ইতিহাস সাক্ষী, বিপ্লবী সরকারগুলোর সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ‘জনগণের অতি-আকাঙ্ক্ষা’। ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই শাসনতান্ত্রিক অনভিজ্ঞতা ও ধীরগতির সংস্কারের কারণে সরকারগুলোর জনপ্রিয়তা দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
নেপালে দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসা বালেণ শাহর সরকার প্রথম মাসেই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত। শ্রীলংকার বামপন্থী সরকার ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহ’ পরবর্তী মানবিক বিপর্যয় সামলাতে ব্যর্থ হয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে। আর বাংলাদেশে জুলাই জাতীয় সনদের অন্তর্ভুক্ত কাঠামোগত ও সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার টানাপোড়েন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভ্যন্তরীণ এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে চলমান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি এবং রেমিট্যান্সের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আইএমএফের ঋণের ওপর টিকে থাকা এই তিন দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি এই বৈশ্বিক ধাক্কায় রীতিমতো কোণঠাসা, যা নতুন সরকারগুলোর গুছিয়ে ওঠার ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বা স্বস্তির সময়কে একেবারে কেড়ে নিয়েছে।
এরই মধ্যে ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও দেশ তিনটি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তার জন্য দিল্লির ওপর নির্ভরতা রয়েছে, অন্যদিকে ভারতের ‘বড় ভাই’ সুলভ আধিপত্যকামী আচরণ প্রতিবেশীদের মনে এক দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে।
নেপালি প্রধানমন্ত্রী বালেণ শাহের অতি-জাতীয়তাবাদী ও খামখেয়ালি আচরণ, যেমন ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে দেখা না করার সিদ্ধান্ত, দিল্লির সঙ্গে কাঠমান্ডুর সম্পর্কে এক নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতাসীন থাকায় দ্বিপাক্ষিক গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে যেমন ইতিবাচক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনই দলটির পরিচয়বাদী রাজনীতি এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ তাড়ানোর কঠোর অবস্থানের কারণে সীমান্তে সর্বদা এক মৃদু উত্তেজনা বিরাজ করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই যুব-বিপ্লবের উত্তাপ থেকে ভারতও কিন্তু সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ভারতের তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশও এখন প্রথাগত কংগ্রেস-বিজেপি মেরুকরণের বাইরে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সন্ধান করছে, যার ছায়া দেখা গেছে তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনে।
এমনকি দিল্লিতে প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে গড়ে ওঠা যুব আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র বড় ধরনের বিক্ষোভ প্রমাণ করে যে, তরুণদের ক্ষোভের বারুদ ভারতের মাটিতেও জমে আছে। হয়তো এটি সেখানে সরকার পতনের মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে না, তবে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলংকার নতুন শাসকেরা এখন অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির এক কঠিন গোলকধাঁধায় বন্দি। ক্ষমতার মসনদ কোনো চিরস্থায়ী রাজপ্রাসাদ নয়, বরং এটি একটি জ্বলন্ত অঙ্গার—এই তিন দেশের নতুন সরকারকে তা মনে রাখতে হবে। বড় ম্যান্ডেট বা বিপুল জনসমর্থন কোনো স্থায়ী স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি দেয় না।
তারা যদি রাজপথের সেই তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক সাম্য ও সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে আরও বড় এবং হয়তো আরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত কোনো গণ-বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়বে। বিপ্লব করা কঠিন, কিন্তু সেই বিপ্লবের ফসল ঘরে তোলা যে আরও হাজার গুণ কঠিন—দক্ষিণ এশিয়া আজ যেন সেই চরম সত্যেরই মুখোমুখি।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।