ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু কেন্দ্রে জাতিসংঘ পরিদর্শকদের ঢুকতে দেবে না ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সুইজারল্যান্ডে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে প্রথম দফার আলোচনা শেষ হতে না হতেই কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করল ইরান। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, গত বছর…
ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে দুটি প্রলয়ঙ্করী ও শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.২ এবং এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর দ্বিতীয় যে কম্পনটি অনুভূত হয় তার মাত্রা ছিল ৭.৫। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর দেশজুড়ে চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাজধানী কারাকাসসহ একাধিক রাজ্যে শত শত বহুতল ভবন ধসে পড়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক জরুরি ভাষণে দেশজুড়ে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলার তদারকির জন্য তিনি সেনাবাহিনীর একজন জেনারেলকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জিওল্জিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রথম ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ইয়ারাকুয়ি অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপে। এর ৩৯ সেকেন্ড পর আঘাত হানা ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ইউমারে শহর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। ইউএসজিএস-এর প্রাথমিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এই জোড়া ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রভূত প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাদের গাণিতিক মডেল অনুযায়ী, ১০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা ৪৪ শতাংশ এবং নিহতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ৩০ শতাংশ। ভূমিকম্পের পরপরই মার্কিন সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ভেনিজুয়েলা, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করলেও পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ভেনিজুয়েলার জনগণের প্রতি সর্বোপরি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ভূমিকম্পে যারা তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন তাদের প্রতি সমবেদনা জানালেও নিখুঁতভাবে নিহতের সংখ্যা এখনো উল্লেখ করেননি। জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের সব ট্রেন ও মেট্রো পরিষেবা আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর জন্য সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস স্থগিত থাকবে। এছাড়া কারাকাসের উপকণ্ঠে অবস্থিত মাইকুয়েতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ছাদের একাংশ ধসে পড়ায় বিমানবন্দরটির সমস্ত কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের তীব্র কম্পন প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়া পর্যন্ত মারাত্মকভাবে অনুভূত হয়েছে।
ভেনিজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেইয়ো জনগণকে অবিলম্বে তাদের বহুতল ঘরবাড়ি ও ভবন ছেড়ে খোলা রাস্তায় বেরিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস-সংক্রান্ত বড় কোনো দুর্ঘটনা এড়াতে জ্বালানি সরবরাহ আগে থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ত্রুহিয়ো, ইয়ারাকুই, কারাবোবো, আরাগুয়া, মিরান্দা, কারাকাস এবং লা গুইরায় ভূমিকম্প তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। তবে রাজধানী কারাকাসের পালোস গ্রান্দেস এবং আল্তামিরা এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে একাধিক বহুতল ভবন হুড়মুড় করে ধসে পড়েছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৯৬৭ সালে ৬.৬ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প কারাকাসে আঘাত হানলে ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সে সময়ও পালোস গ্রান্দেস এবং আল্তামিরা এলাকায় অনেক ভবন ধসে পড়েছিল। তবে এবারের ভূমিকম্পটি ১৯৬৭ সালের সেই প্রাণঘাতী দুর্যোগের চেয়েও বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ছিল বলে জানিয়েছেন ৫৬ বছর বয়সী প্রত্যক্ষদর্শী কোরো মার্তিনেজ। কারাকাসের চাকাও এলাকার মেয়র গুস্তাভো দুকে সায়েজ জানিয়েছেন, তাঁর এলাকায় অন্তত দুটি বড় ভবন সম্পূর্ণ ধসে গেছে। সেখান থেকে এ পর্যন্ত ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৫০০-এরও বেশি জরুরি উদ্ধারকর্মী ধ্বংসস্তূপের নিচে তল্লাশি চালাচ্ছেন। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ ও জরুরি আশ্রয়ের জন্য প্লাজা আল্তামিরা এবং প্লাজা লস পালোস গ্রান্দেসে দুটি বিশেষ জরুরি তথ্য কেন্দ্র স্থাপন করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
রাজনৈতিকভাবে সংকটাপন্ন ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গত জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী আটক করে মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের জন্য নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে দেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তীকালীন ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করছেন। এই বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাঝেই এমন প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটিকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। কারাকাসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, তারা ভেনিজুয়েলার ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং মার্কিন নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও এলাকা এড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।