ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি দ্বিতীয় ধাপে: নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্পের ক্ষোভ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক চুক্তি শেষে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুরু হচ্ছে শুক্রবার। জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্পের বড় ঘোষণা এবং লেবানন ইস্যুতে নেতানিয়াহুর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ব রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-খণ্ডে চলমান যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আন্তর্জাতিক মহলের তুমুল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ইরানের সঙ্গে হওয়া ঐতিহাসিক প্রাথমিক চুক্তির অফিশিয়াল নথি প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রশাসন।
‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ শিরোনামের এই ১৪ দফার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিতে মূলত হরমুজ প্রণালি অবমুক্ত করা, ইরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল, তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিষ্ক্রিয়করণের ন্যূনতম পদ্ধতি নির্ধারণ এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি টেকসই চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর আইনি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানিয়েছেন, তীব্র জনসমালোচনা ও বিশ্ব রাজনীতির অস্পষ্টতা দূর করতেই এই পূর্ণাঙ্গ পাঠ জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারকে দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিরা সই করবেন এবং এর পরেই শুরু হবে চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত নিয়ে ৬০ দিনের কাউন্টডাউন ও কূটনৈতিক দরকষাকষি।
প্রকাশিত সরকারি নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং চলমান প্রলয়ংকারী যুদ্ধে জড়িত তাদের সব মিত্র পক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান চিরতরে বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে পূর্ণ সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যতে কোনো প্রকার যুদ্ধ, উসকানি বা সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকার অমোঘ অঙ্গীকার করেছে। এই চুক্তিতে লেবাননের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।
সমঝোতা স্মারকটি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ তুলে নেবে। এর বিপরীতে, ইরানও পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ এবং সম্পূর্ণ বিনা খরচে চলাচল নিশ্চিত করতে তাদের সর্বোচ্চ সামরিক ও কৌশলগত চেষ্টা জারি রাখবে।
এই নৌ-পথের প্রযুক্তিগত বাধা ও সাগরে বিছানো মাইন অপসারণের কাজ ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ সামুদ্রিক সেবা ব্যবস্থার বিষয়ে ওমানসহ পারস্য উপসাগরীয় উপকূলবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন মেনে আলোচনায় বসবে তেহরান।
নথির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক অংশে দেখা গেছে, ওয়াশিংটন তাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে এর বাস্তবায়ন রূপরেখা তৈরি করা হবে এবং এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় যাবতীয় লাইসেন্স ও ছাড়পত্র দেবে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির পারস্পরিক সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে থাকা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সিদ্ধান্ত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কাজ সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ইরানি অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং ও বীমা সেবার ওপর তাৎক্ষণিক ছাড়পত্র বহাল রাখবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ।
সবচেয়ে সংবেদনশীল পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান বিশ্বমঞ্চে পুনরুল্লেখ করেছে যে, তারা কখনোই কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। তবে সরকারি পাঠে একটি নতুন আইনি ভাষা যোগ করে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আইএইএ’র কঠোর তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিম্নমাত্রার উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হবে, যা এর আগে ফাঁস হওয়া খসড়া নথিতে ছিল না।
চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষই বর্তমান স্থিতাবস্থা বা ‘স্ট্যাটাস কো’ লঙ্ঘন করতে পারবে না; অর্থাৎ ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন করবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রও নতুন কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করতে পারবে না। সমঝোতা কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই ইরানের স্থগিত বা জব্দ হওয়া বিপুল পরিমাণ আর্থিক তহবিল ব্যবহারের অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
সমগ্র চুক্তিটি সঠিকভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণে একটি শক্তিশালী ‘executive oversight mechanism’ বা নির্বাহী তদারকি ব্যবস্থা গঠন করা হবে এবং চূড়ান্ত চুক্তিটি পরবর্তীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনি স্বীকৃতি লাভ করবে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা এই সমঝোতা স্মারকটিকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘রাজনৈতিক নথি’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এই চুক্তির মূল লক্ষ্যই হলো দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়া এবং ইরানকে স্থায়ী পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে ফিরিয়ে আনা।