আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চীনের তৈরি অত্যাধুনিক ২০টি ‘J-10CE’ মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার মহাপরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। এই সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এক লাফে বহুগুণ বেড়ে যাবে। তবে একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ায় বেইজিংয়ের সামরিক প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাওয়ার এই খবরটি ভারতের নিরাপত্তা মহলে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের সূত্রানুযায়ী, প্রস্তাবিত এই বিশাল সামরিক প্যাকেজের সম্ভাব্য বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ২২০ কোটি মার্কিন ডলার। এই চুক্তির আওতায় কেবল যুদ্ধবিমানই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক সাপোর্ট, পাইলট ও ক্রুদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। চুক্তি সফল হলে ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এই যুদ্ধবিমানগুলো বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হতে পারে।
কতটা শক্তিশালী এই চীনা J-10C? চেংদু (Chengdu) কোম্পানির তৈরি J-10C মূলত ৪.৫ প্রজন্মের (4.5 Generation) একটি অত্যন্ত আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। এতে রয়েছে শক্তিশালী এইসা (AESA) রাডার ব্যবস্থা, যা চোখের পলকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া বিমানটি আধুনিক নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক কমব্যাট সিস্টেম এবং দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে আঘাত হানার ক্ষেপণাস্ত্র (Air-to-Air Missile) ছুড়তে সক্ষম। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক আকাশযুদ্ধে এই ফাইটার জেটটি অত্যন্ত বিধ্বংসী ভূমিকা রাখতে সক্ষম, যা এই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
ভারতের দুশ্চিন্তা ও আঞ্চলিক সমীকরণ: বাংলাদেশের এই সম্ভাব্য সামরিক আধুনিকায়ন ভারতের প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারকদের বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। বিশেষ করে ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘সিলিগুড়ি করিডোর’ (যা চিকেন’স নেক নামে পরিচিত) নিয়ে দিল্লির দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি। মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার চওড়া এই করিডোরটির মাধ্যমেই ভারত তার মূল ভূখণ্ডের সাথে আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার মতো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর যোগাযোগ রক্ষা করে।
কৌশলগতভাবে এই করিডোরটি বাংলাদেশের রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের উত্তর সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত। ফলে, বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে সামরিক শক্তির যেকোনো বড় পরিবর্তন ভারতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিরক্ষা নীতিতে এক ধরনের নতুন কৌশলগত সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) প্রকল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনের এই প্রতিরক্ষা বিনিয়োগকে ভারত কেবল একটি সাধারণ সার্বভৌম সামরিক ক্রয় হিসেবে দেখছে না; বরং একে এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বিস্তারের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে দিল্লি। এই আধুনিক ফাইটার জেট বাংলাদেশের আকাশসীমায় যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি যে আরও জটিল হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।