সম্পাদকীয়

তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণ: একজন শিক্ষকের মহৎ সংগ্রাম ও পাহাড়ের শিক্ষার নতুন দিগন্ত

তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণ: একজন শিক্ষকের মহৎ সংগ্রাম ও পাহাড়ের শিক্ষার নতুন দিগন্ত

সম্পাদকীয় ডেস্ক: শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, বরং তা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাংলাদেশের ভৌগোলিক মানচিত্রে এমন কিছু দুর্গম অঞ্চল রয়েছে, যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছাতে বা একটি বিদ্যাপীঠকে টিকিয়ে রাখতে মানুষকে অতিমানবীয় লড়াই করতে হয়। বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ তিন্দুর গল্পটি ঠিক তেমনই এক চরম আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের জলন্ত দলিল।

গত রবিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন।

তিনি মহান সংসদকে জানান, থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণ বা সরকারি করার জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছেন এবং এর প্রক্রিয়া দ্রুতই শুরু হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা এই সংবেদনশীল ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে আমরা অন্তরের অন্তস্তল থেকে সাধুবাদ জানাই।

এই ঘোষণা কেবল একটি বিদ্যালয়কে সরকারি করার প্রথাগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি মূলত পাহাড়ের এক লড়াকু শিক্ষকের সততা, নিষ্ঠা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণের এই অর্জনের পেছনে মিশে আছে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনের এক রূপকথাতুল্য ত্যাগের গল্প, যা সম্প্রতি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ২০২০ সালে অবহেলিত পাহাড়ি উপজাতি ও নৃগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়াতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলেও, দারিদ্র্যের চরম কষাঘাতে জর্জরিত স্থানীয় অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলের সামান্য বেতনটুকুও নিয়মিত পরিশোধ করতে পারতেন না।

ফলশ্রুতিতে, শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে দমে না গিয়ে প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন কাঁধে তুলে নেন এক অনন্য দায়িত্ব। স্কুলের ছুটির দিনগুলোতে তিনি দুর্গম ও বিপজ্জনক থানচি–তিন্দু–রেমাক্রী নৌপথে নিজে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করা শুরু করেন।

কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কেবল চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসেই তিনি নৌকা চালিয়ে আয় করেন প্রায় ৪০ হাজার টাকা, যার সিংহভাগ (৩০ হাজার টাকা) তিনি বিলিয়ে দেন নিজের সহকর্মীদের বেতন হিসেবে। একজন প্রধান শিক্ষকের এমন নিঃস্বার্থ ও হাড়ভাঙা শ্রমের বিনিময়ে পাহাড়ের একটি স্কুল টিকে থাকার এই ঘটনা সভ্য সমাজকে যেমন নাড়া দিয়েছে, তেমনি আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কিছু অবহেলিত ক্ষতকেও সামনে এনেছিল।

তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের এই সিদ্ধান্ত সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম (বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি) অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বিস্তারে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

দুর্গমতার কারণে পাহাড়ি এলাকার বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে যোগ্য শিক্ষকরা যেতে চান না, আর গেলেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে টিকতে পারেন না। জাতীয়করণের ফলে শিক্ষকরা সরকারি বেতন-ভাতা ও স্থায়িত্ব পাবেন, যা তিন্দু বিদ্যালয়ে মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকদের ধরে রাখতে এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

এই অঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থী চরম দরিদ্র পরিবারের। স্কুলটি সরকারি হওয়ায় এখন শিক্ষার্থীদের আর বেতনের দুশ্চিন্তা করতে হবে না। বিনামূল্যে বই, উপবৃত্তি এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ফলে পাহাড়ি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার শূন্যে নেমে আসবে।

জাতীয়করণের আওতায় আসায় স্কুলটিতে এখন দ্রুত সরকারি অর্থায়নে নতুন আধুনিক ভবন, বিজ্ঞানাগার, আইসিটি ল্যাব এবং সুরক্ষিত ছাত্রাবাস নির্মিত হবে। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে যেসব শিক্ষার্থী প্রতিদিন যাতায়াত করতে পারে না, ছাত্রাবাস সংস্কারের ফলে তারা সহজে সেখানে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।

প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াংয়ের সংগ্রাম ও তার এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পার্বত্য অঞ্চলের অন্য শিক্ষানুরাগী ও সমাজকর্মীদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের যৌক্তিক ও সৎ লড়াই কখনো বৃথা যায় না; রাষ্ট্র আজ হোক বা কাল হোক, তার মর্যাদা দিতে বাধ্য।

আমরা মনে করি, তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই জাতীয়করণ যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে আটকে না পড়ে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে বিদ্যালয়টির গেজেট প্রকাশ করা। একই সাথে, প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনকে তাঁর এই অনন্য ত্যাগের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করা উচিত।

পাহাড়ের প্রতিটি শিশু যেন তাদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার আলো পায় এবং মূলধারার সাথে কাঁধ মেলাতে পারে, তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

গুমের শিকার পরিবারগুলোর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ভাতা: অন্ধকারের অবসান ও ন্যায়বিচারের শুভসূচনা

গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য বিশেষ সরকারি ভাতা ও পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গুমের স্থায়ী প্রতিকারে সম্পাদকীয় কলাম।

গুজব প্রতিরোধ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা: প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও আইনি জবাবদিহিতার সমন্বয় জরুরি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেক আইডি ও গুজব রটনাকারীদের শাস্তির বিধান সাইবার সুরক্ষা আইনে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।

সংসদে নতুন জুয়া প্রতিরোধ বিল: অনলাইন জুয়ার মরণছোবল থেকে যুবসমাজকে রক্ষার এখনই সময়

সংসদে ২৪ ধরনের অপরাধ অন্তর্ভুক্ত করে নতুন জুয়া প্রতিরোধ বিল এনেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। অনলাইন জুয়া থেকে যুবসমাজকে রক্ষায় সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ।

মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সফর শেষে চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অংশ নেবেন সামার দাভোস ফোরামে, এরপর যাবেন বেইজিংয়ে।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শীর্ষ বৈঠক ও শ্রমবাজার উন্মুক্তের আহ্বান

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। সাশ্রয়ী ও সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজার এবং আসিয়ান পার্টনারশিপের ওপর জোর।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর: মালয়েশিয়ায় লালগালিচা সংবর্ধনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে মালয়েশিয়া পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্য।

শব্দ ও শেকড়ের কারিগর কবি আল মুজাহিদীর প্রয়াণ: বাংলা সাহিত্যে একটি যুগের অবসান

বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের বরেণ্য কবি, গবেষক ও দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক আল মুজাহিদী রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন।

রাজধানীর এআই ট্রাফিক ক্যামেরা: প্রযুক্তির উপযোগিতা বনাম বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

কারওয়ান বাজার ও বাংলামোটরের এআই ট্রাফিক ক্যামেরা বন্ধের গুজব নাকচ করেছে ডিএমপি। ঢাকার বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ট্রাফিক ক্যামেরা কতটুকু কার্যকর তার সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ।

Search