সম্পাদকীয়: বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান সারথী, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অকুতোভয় কণ্ঠস্বর, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য কবি ও প্রবীণ সাংবাদিক আল মুজাহিদী আর নেই। আজ (২১ জুন, ২০২৬) রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
সুস্থ ধারার সাহিত্য ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই পুরোধা ব্যক্তিত্বের আকস্মিক প্রয়াণের খবরে দেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কবি আল মুজাহিদীর চলে যাওয়া কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং বাংলা কবিতার একটি ঐতিহ্যবাহী সোনালী অধ্যায়ের অবসান।
১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী কবি আল মুজাহিদী ষাটের দশকের সেই উত্তাল ও সৃষ্টিশীল সময়ে বাংলা কবিতার পরিমণ্ডলে আত্মপ্রকাশ করেন, যখন এদেশের মানুষ নিজেদের অধিকার ও জাতিসত্তা অন্বেষণে উন্মুখ। প্রথম থেকেই তাঁর লেখনী অনন্য ধারায় দেদীপ্যমান হয়ে ওঠে।
তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের পলিমাটি, আপামর মানুষ, সুদীর্ঘ ইতিহাস, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও লড়াকু সংস্কৃতির এক গভীর মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। মৃত্তিকার গভীর থেকে রসদ নিয়ে তিনি সাজিয়েছেন তাঁর উপমা আর শব্দশৈলী। প্রকৃতি, প্রেম, মরমি আত্মদর্শন এবং জাতীয় চেতনার যে তীব্র স্ফূরণ তাঁর ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে, তা সমসাময়িক কবিদের মাঝে তাঁকে এক স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
তাঁর কবিতা কেবল নান্দনিকতার মোড়কে বন্দী ছিল না; তা ছিল বাঙালি জাতিসত্তা ও মানবিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত দলিল।
দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য সাহিত্যজীবনে আল মুজাহিদী কেবল কবিতার সীমানায় নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে তিনি সমান দক্ষতায় গল্প, উপন্যাস, নাটক, শিশুসাহিত্য ও মননশীল প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক, যা তাঁর ক্লান্তিহীন সৃজনশীলতারই অকাট্য প্রমাণ। সাহিত্যের সমান্তরালে তিনি সাংবাদিকতার জগতেও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
সুদীর্ঘকাল ধরে তিনি ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সুবাদে বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে দুই থেকে তিন প্রজন্মের নতুন ও তরুণ লেখকদের আবিষ্কার, পরিচর্যা ও বিকাশে তিনি যে অভিভাবকত্বসুলভ ভূমিকা রেখে গেছেন, তা এদেশের সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর এই অসামান্য ও কালজয়ী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।
কবি আল মুজাহিদীর লেখনীর আবেদন কেবল দেশের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; দুই বাংলার সাহিত্যপ্রেমী ও বিদগ্ধ পাঠকদের কাছেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সমাদৃত ও শ্রদ্ধেয়। তাঁর রচনাশৈলীতে গ্রামীণ জীবনের চিরায়ত রূপ যেমন মূর্ত হতো, তেমনি নৃবিজ্ঞান, সমাজকাঠামো ও সমকালীন রাজনীতির এক গভীর মননশীল পর্যবেক্ষণও প্রতিভাত হতো।
শেকড়ের প্রতি অবিচল অনুরাগ এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম মমত্বই ছিল তাঁর জীবনদর্শনের মূল চালিকাশক্তি। তাঁর এই মহাপ্রয়াণ বাংলা ভাষা ও মননশীল সংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ও অপূরণযোগ্য ক্ষতি। তবে দেহাবসান ঘটলেও তাঁর কালজয়ী কবিতা, সৃষ্টিশীল চিন্তা ও বিপুল সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অন্তহীন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতি তাঁকে চিরদিন বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করবে। পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা মরহুম কবিকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার ও ভক্ত-অনুরাগীদের এই শোক সইবার শক্তি দিন। আমিন।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।