গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক দূষণ রোধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ | দৈনিক শব্দমিছিল
গুলশান-বনানী-বারিধারা-নিকেতন লেকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি দূষণ রোধে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দেশের প্রায় প্রতিটি প্রধান শহরের অন্যতম প্রধান অভিশাপ ও জনদুর্ভোগের কারণ হলো যানজট এবং ফুটপাত দখল। ফুটপাত তৈরি করা হয় পথচারীদের নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে চলাচলের জন্য, কিন্তু একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী চক্রের কারণে তা পরিণত হয় অবৈধ হকারদের অভয়ারণ্যে। এই নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে এবার এক নজিরবিহীন ও কঠোর প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক)। নগরীর রানীরবাজার এলাকায় ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকান ও হকার বসিয়ে আর্থিক ফায়দা লোটার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আজ সোমবার (৬ জুলাই, ২০২৬) দুপুরে কুসিকের পক্ষ থেকে আটটি স্বনামধন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মুস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক স্মারকে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বারবার সতর্ক করার পরও আইন অমান্য করায় কুসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন ও সিটি প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপুর এই কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার এবং এটি দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের জন্য একটি অনুকরণীয় বার্তা।
কুসিকের তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক সত্য। আমরা সাধারণত মনে করি, হকাররা পেটের দায়ে বা নিরূপায় হয়ে ফুটপাতে বসে। কিন্তু রানীরবাজার এলাকার বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সেখানকার বড় বড় স্থায়ী ব্যবসায়ীরা নিজেদের দোকানের সামনের ফুটপাতটি অবৈধ হকার ও ভ্যানগাড়িচালকদের কাছে চড়া মূল্যে ‘ভাড়া’ দিয়ে আসছিল। স্থগিত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা—সারা বয়লার হাউস, আরব সুইট অ্যান্ড বেকারি, ট্রাই বেকারি, কাজী ফজলুল হক স্টোর, জেলিকা বেকারি, আল বারাকা হোটেল, মেসার্স হাজী অ্যান্ড সন্স এবং আবেদন স্টোর—প্রমাণ করে যে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরাই মূলত এই ফুটপাত দখলের নেপথ্যের মূল কারিগর। নিজেরা কর দিয়ে ব্যবসা করার লাইসেন্স পেয়ে, রাষ্ট্রের ফুটপাতকে ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক সম্পত্তি বানিয়ে ভাড়া দেওয়ার এই ধৃষ্টতা কেবল বেআইনি নয়, বরং চরম অনৈতিক। এর ফলে সৃষ্ট তীব্র যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে পুরো নগরী, আর পথচারীরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করেন, যা প্রায়শই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের এবং শুধরে যাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। একাধিকবার নোটিশ প্রদান, মাইকিং, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ, এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার পরও এই অসাধু ব্যবসায়ীরা তা পাত্তাই দেয়নি। আইন ও রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর এই মানসিকতাই মূলত আমাদের শহরগুলোকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। সম্প্রতি কুসিকের অভিযানে ৩০টি অবৈধ ভ্যান বিনষ্ট করা এবং একটি ভবনের পার্কিংয়ে হকারদের ভ্যান রাখার জায়গা দেওয়ার অপরাধে ভবন কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এবারের অভিযান কোনো লোকদেখানো ‘আইওয়াশ’ নয়, বরং একটি টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে পরিকল্পিত প্রয়াস।
তবে কেবল সাময়িক স্থগিতাদেশ বা উচ্ছেদ অভিযানই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গ্যারান্টি হতে পারে না। অতীতে দেখা গেছে, অভিযানের কয়েকদিন পর বা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আবারও হকাররা জায়গা দখল করে নেয়। এই চক্রাকার জনদুর্ভোগ বন্ধ করতে কুসিককে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে:
একটি বাসযোগ্য, সুন্দর ও যানজটমুক্ত কুমিল্লা নগরী গড়ে তোলার যে যুদ্ধ কুসিক শুরু করেছে, তার সাফল্য নির্ভর করছে এই অভিযানের ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতার ওপর। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে, ‘সবার আগে নাগরিক স্বস্তি’—এই দর্শনকে সামনে রেখে কুসিক তাদের এই কঠোর ও সাহসী অভিযান অব্যাহত রাখবে—এটাই কুমিল্লার সর্বস্তরের জনগণের প্রত্যাশা।