সম্পাদকীয়

দল-মত ভুলে দেশের স্বার্থে জাতির স্বার্থে জুলাইকে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে : এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশের অর্জনের ইতিহাসে ২০২৪ সালের ‘জুলাই বিপ্লব’ এক অবিস্মরণীয় ও রক্তস্নাত অধ্যায়। ফ্যাসিবাদের ভয়াল থাবা, প্রশাসনিক নিপীড়ন এবং স্বৈরাচারী শাসনশোষণের শিকল ভেঙে এ দেশের ছাত্র-জনতা যে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, তা কেবল একটি সরকারের পতনই ঘটায়নি, বরং রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক ভিত্তি স্থাপন করেছে।

স্বৈরাচারমুক্ত একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সার্বভৌম রাষ্ট্র নির্মাণের যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল, সেই জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে আজ দল-মত ও রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল মূলত সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অসংবেদনশীল মনোভাব, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে নৃশংস দমন-পীড়ন সাধারণ ছাত্র-জনতাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

আন্দোলনের প্রথম পর্যায় (কোটা সংস্কার আন্দোলন): জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান প্রধান বিদ্যাপীঠে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন রাজপথে রূপ নেয়। ১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও ব্লকেড কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যান।

সহিংসতা ও ছাত্র-জনতার গণবিস্ফোরণ: তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার বিতর্কিত মন্তব্য এবং দলীয় ক্যাডার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সাঈদের বুক পেতে গুলির সামনে দাঁড়িয়ে শাহাদাত বরণ, ঢাকার মুগ্ধ ও হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলে এটি কেবল ছাত্রদের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শ্রমজীবী, অভিভাবক, শিক্ষক ও সর্বস্তরের জনগণ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড, গ্রেপ্তার ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের প্রতিবাদে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে কোটা আন্দোলন রূপান্তরিত হয় স্বৈরাচারী সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ দাবিতে।

‘জুলাই গণহত্যা’ ও হাজারো বীর শহীদ এবং পঙ্গুত্ব বরণকারী যোদ্ধাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অগাস্টের শুরুতেই নেমে আসে ছাত্র-জনতার উত্তাল ঢেউ। অবশেষে ৫ অগাস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত রূপ দেখে বিশ্ব এবং তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগে বাধ্য হন।

স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর বাংলাদেশে আজ নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠন, অর্থনীতির সুসংহতকরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই সংকটময় সন্ধিক্ষণে যদি রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি, আধিপত্য বিস্তার ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে লিপ্ত হয়, তবে গণঅভ্যুত্থানের হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে।

একটি স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আমলাতান্ত্রিক সংস্কার সাধনে সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ঐক্য প্রয়োজন।

দেশ পরিচালনা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর এজেন্ডা নয়; বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষাই হবে প্রধান লক্ষ্য।

জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের তরুণ সমাজ প্রমাণ করেছে যে তারা রাষ্ট্রের অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল। এই তরুণ শক্তির উদ্ভাবনী চিন্তা ও দেশপ্রেমকে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে কাজে লাগাতে হবে।

জুলাই আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কীভাবে পুরো জাতি এক সুতোয় গেঁথে যেতে পারে। ব্যক্তিগত, দলীয় বা গোষ্ঠীগত বিভেদ ভুলে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আজ সেই ‘জুলাই চেতনা’কে ধারণ করতে হবে। দল-মত নির্বিশেষে আমরা যদি এক ও অভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে দেশের সুরক্ষা, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি, তবেই একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।

Related News

সংলাপ ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা – রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণধর্মী কলাম।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ফেনী সফর; উন্নয়ন, আবেগ ও সুশাসনের চিত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর, কৃষক কার্ড বিতরণ, মহুরী সেচ প্রকল্প ও ১০০ শয্যার হাসপাতাল ঘোষণা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক শৃঙ্খলার পরীক্ষা ও সরকারের দায়বদ্ধতা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, সরকারের বিব্রতবোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বেঁধে দেওয়া ঠিক হবে না : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার বিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থায়ী রূপরেখা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

খেলাপি ঋণের পাহাড় ও ব্যাংকিং খাতের সংকট: কাগজের শিথিলতা নয়, চাই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি

বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও সংকটাপন্ন ঋণের সর্বশেষ চিত্র, কাঠামোগত ত্রুটি এবং ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে চার দফা জরুরি সুপারিশ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা অনুপ্রবেশকারী ও অপশক্তির ষড়যন্ত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও ভাঙচুর, হাইব্রিড নেতাদের অপতৎপরতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

চুয়েট উপাচার্য নিয়োগ বিতর্ক ও সংকট : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

চুয়েট উপাচার্য অপসারণ, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নতুন ভিসির অনলাইনে যোগদান ও শিক্ষাঙ্গনের অচলাবস্থা নিরসনে করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: বৈশ্বিক মঞ্চে সুশাসন, শান্তি ও টেকসই প্রগতির দৃপ্ত বার্তা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, জলবায়ু তহবিল, রোহিঙ্গা সংকট ও বিশ্বশান্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search