যশোর কারাগারে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন নারী হাজতি
ঝিনাইদহ থেকে খুলনা নেওয়ার পথে চলন্ত অ্যাম্বুলেন্সে পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের এক নারী হাজতি। মা ও শিশু সুস্থ রয়েছে।
দেশে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে শিশুধর্ষণের ঘটনা। পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে শিশুধর্ষণের মামলা বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসের তুলনায় এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। সমাজ ও নাগরিক জীবনে এটি চরম উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে ১১ বছরের এক শিশুকে বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের পর ভিডিও ধারণ এবং সেই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার মতো নৃশংস ঘটনা পুলিশে তালিকাভুক্ত শত শত শিশুধর্ষণ মামলারই একটি বাস্তব চিত্র।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কেবল বাড়ছেই না, বরং ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের চিত্র ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে।
চলতি বছর (জুলাই পর্যন্ত): ১,৪৮৫টি শিশুধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত বছর (একই সময়ে): মামলা হয়েছিল ৯৯৮টি। ২০২৪ সাল (একই সময়ে): মামলার সংখ্যা ছিল ৭৫১টি।
সার্বিকভাবে চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে ১২ হাজার ৪৪৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ধর্ষণের অভিযোগেই মামলা হয়েছে ৪ হাজার ২৫টি। এছাড়া বিগত ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ২১,৯৩৯টি মামলার মধ্যে ৭,০৬৮টিই ছিল ধর্ষণের মামলা, যার মধ্যে ১,৮৯৭টি ক্ষেত্রে শিকার হয়েছে শিশুরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে শিশুধর্ষণের বড় একটি অংশ ঘটে পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়, প্রতিবেশী বা বিশ্বাসভাজন মানুষদের মাধ্যমে।
তিনি উল্লেখ করেন, অনেক সময় পরিবার সামাজিক লোকলজ্জার ভয় বা চাপে পড়ে ঘটনা গোপন রাখার চেষ্টা করে কিংবা অভিযোগ জানাতে দেরি করে। এর ফলে তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তবে ভুক্তভোগীবান্ধব পরিবেশ তৈরি, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা এবং সমন্বিত সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
গফরগাঁওয়ের ঘটনায় শিশুটির পরিবার জানিয়েছে, ঘটনার তিন মাস পার হলেও প্রধান আসামি আল আমিন গ্রেপ্তার হয়নি। উল্টো পরিবারটিকে অর্থ ও সামাজিক সালিসের প্রলোভন দেখাচ্ছে অভিযুক্তের পক্ষ। তবে স্থানীয় থানা পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, ধর্ষণের মামলা আপসযোগ্য বা সালিসযোগ্য নয় এবং আসামিকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।
এদিকে দেশে পল্লবীতে শিশুধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বিচারক সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড বা মাগুরায় শিশুধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার মতো দ্রুত বিচারের দৃষ্টান্ত থাকলেও উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে ৩০ হাজার ৩৬৫টি মামলা।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন:
“শিশুধর্ষণের ঘটনা এখন নাগরিক জীবনে চরম উৎকণ্ঠার জায়গায় পৌঁছে গেছে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মূল্যবোধ ও নারীর প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণের শিক্ষা দেওয়া জরুরি।”